যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত ৯ ফেব্রুয়ারি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ। চুক্তিটির চতুর্থ অধ্যায়ে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ ‘পরিপূরক ব্যবস্থা’ (কমপ্লিমেন্টারি মেজারস) গ্রহণ করবে।
এর আওতায় ওয়াশিংটন ঢাকার ওপর জিসমিয়া (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট) এবং আকসা (অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট) নামে দুটি সামরিক চুক্তি সইয়ের চাপ দিচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ঢাকা এখনই সামরিক খাতের এ দুটি চুক্তি করতে প্রস্তুত নয়; বিষয়টি নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করতে চায় সরকার।
সামরিক খাতের এই দুই চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বিষয়ে দৈনিক সময়ের আলোর পক্ষ থেকে গত ১৮ মে ই-মেইলসহ একাধিক মাধ্যমে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কাছে জানতে চাওয়া হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে চান না।
তার ভাষ্য, ‘এ দুটি খুবই সাধারণ চুক্তি। বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের এমন চুক্তি রয়েছে। এগুলো ইতিবাচক ধরনের সমঝোতা।’
বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ‘চুক্তি নিয়ে মার্কিন চাপ রয়েছে। তবে এখনই কিছু হচ্ছে না। যখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে, সরকার আনুষ্ঠানিকভাবেই তা জানাবে।’ সরকারের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘বড় শক্তিধর দেশগুলোর কিছু চাহিদা থাকতেই পারে। দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গত ১৮ মে সংক্ষিপ্ত সফরে ওয়াশিংটন ডিসি যান। সফরকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ব্যুরোর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এস. পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে উভয়পক্ষ বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ঊর্ধ্বমুখী অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
পাশাপাশি বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকায় কর্মরত ভারতের দুই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ভারতসহ একাধিক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের সামরিক চুক্তি করেছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু না জেনে মন্তব্য করা কঠিন। একই সঙ্গে তারা বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের তিন দিন আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাংলাদেশের এআরটি চুক্তি সম্পাদন নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এআরটি কোনো সাধারণ বাণিজ্য চুক্তি নয়। এতে মোট পাঁচটি অধ্যায় রয়েছে, যেখানে দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ।
এতে রফতানি নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি দণ্ড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপরিহার্য স্বার্থ’ বিপন্ন করতে পারে। তবে বিদ্যমান চুল্লিগুলোর জন্য পূর্বনির্ধারিত সরবরাহ বা প্রযুক্তি চুক্তির ক্ষেত্রে এ শর্ত প্রযোজ্য হবে না।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল জয়লাভের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই চিঠিতে তিনি এআরটি চুক্তি বাস্তবায়ন এবং প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
চিঠিতে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি আশা করি, আপনি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের এই গতি বজায় রাখতে সহায়তা করবেন। একই সঙ্গে আমি আশা করি, আপনি প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো সম্পন্নে দৃঢ় পদক্ষেপ নেবেন, যা আপনার সামরিক বাহিনীকে উচ্চমানের মার্কিন সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ দেবে।’
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গত ৫ থেকে ৭ মে ঢাকা সফর করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সফরকালে মার্কিন প্রতিনিধিরা এআরটি বাস্তবায়ন এবং সামরিক চুক্তিগুলো সম্পন্নে বাংলাদেশের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন।
এআরটি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়ী বন্দরের অবকাঠামোগত প্রবেশাধিকার দিচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, জ্বালানি সরবরাহ এবং অন্যান্য খাতে মার্কিন বিনিয়োগ ও বাজার প্রবেশের সুযোগও বাড়ানো হচ্ছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে শুল্ক ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনে এবং কিছু পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়।
ঢাকায় দায়িত্ব পালন শেষে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস গণমাধ্যমে জিসমিয়া ও আকসা চুক্তি নিয়ে বলেন, ‘এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব হবে। জিসমিয়া চুক্তি সামরিক ক্রয়-সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য বিনিময়ের কাঠামো নির্ধারণ করবে এবং বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে সহায়তা করবে। অন্যদিকে আকসা চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জলসীমায় দুই দেশের সামরিক বাহিনী একে অপরকে লজিস্টিক সহায়তা দিতে পারবে। জ্বালানি, খাদ্য, যন্ত্রাংশ বা জরুরি সরঞ্জাম বিনিময়ের সুযোগও তৈরি হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো কোনো সামরিক জোট বা বিস্তৃত প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়। বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করেছে।’
সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. মাহফুজুর রহমান, যিনি একসময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুক্তরাষ্ট্র ডেস্কের দায়িত্বে ছিলেন, দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ‘চুক্তিগুলোর খসড়া এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে এ নিয়ে জনপরিসরে মন্তব্যের সুযোগ সীমিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের আগ্রহ এবং সাম্প্রতিক সময়ে সেই আগ্রহের বৃদ্ধি থেকে বোঝা যায়, এতে ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থ বড় ভূমিকা রাখছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি শুধু টেকনিক্যাল বা সামরিক চুক্তি নয়; এটি অত্যন্ত রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়। বাংলাদেশের আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত অবস্থানের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই তাড়াহুড়ো না করে আরও সময় নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করা উচিত। যেসব দেশ এ ধরনের চুক্তি করেছে, তাদের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।’
মাহফুজুর রহমানের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিগুলোতে আগ্রহী। ‘এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; এর বহুপক্ষীয় প্রভাবও রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে,’ বলেন তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আমিনুল করিম বলেন, ‘জিসমিয়া ও আকসা চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চায়। ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতেই যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের চুক্তিতে আগ্রহী।’
তিনি বলেন, ‘এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশও কিছু ক্ষেত্রে উপকৃত হতে পারে। দুই দেশের সামরিক যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়বে। তবে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে চীনের প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।’