ধর্ষণ রুখতে চাই ভিকটিম সুরক্ষা আর সামাজিক প্রতিরোধ

অলিউল ইসলাম

জাতীয়

গত দুই সপ্তাহে দেশে ধর্ষণ কিংবা বলাৎকারের পর হত্যা করা হয়েছে ৫ শিশুকে। সবশেষ রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা

2026-05-22T03:15:49+00:00
2026-05-22T03:15:49+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বিশেষজ্ঞ মত
ধর্ষণ রুখতে চাই ভিকটিম সুরক্ষা আর সামাজিক প্রতিরোধ
অলিউল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২২ মে, ২০২৬, ৩:১৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
গত দুই সপ্তাহে দেশে ধর্ষণ কিংবা বলাৎকারের পর হত্যা করা হয়েছে ৫ শিশুকে। সবশেষ রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা ও মরদেহ খণ্ডিত করার ঘটনায় দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনা সামনে এনেছে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, বিচারহীনতা, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং সমাজে বাড়তে থাকা সহিংস সংস্কৃতির প্রশ্ন। 

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, দেশে কঠোর আইন ও সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান থাকলেও দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত, ভিকটিম সুরক্ষার অভাব এবং ‘শক্তি যার, ক্ষমতা তার’ ধরনের সামাজিক বাস্তবতা অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি করছে। তাদের মতে, দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার, দক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ ছাড়া নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা কমানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় শিশু নীতি ২০১১-তেও শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ, সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে শিশুদের প্রতি সব ধরনের সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে।

আইনজীবীরা বলছেন, রামিসা হত্যাকাণ্ডে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত) এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর একাধিক ধারা প্রযোজ্য হবে। তদন্ত ও আসামির জবানবন্দিতে ধর্ষণের পর হত্যার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা ৯(২) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। 

এই ধারায় ধর্ষণের পর হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে ন্যূনতম এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডও করা যেতে পারে। এ ছাড়া দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। 

মরদেহ খণ্ডিত করে গোপনের অভিযোগে ২০১ ধারা যুক্ত হতে পারে, যেখানে আলামত নষ্ট বা অপরাধ আড়াল করার চেষ্টার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে। একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে ৩৪ ধারায় যৌথ অপরাধ হিসেবে সবাইকে সমান দায়ে অভিযুক্ত করা যাবে। অপহরণ বা আটকে রাখার অভিযোগ প্রমাণ হলে ৩৬৪, ৩৬৭ ও ৩৬৮ ধারাও যুক্ত হতে পারে।

আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে দ্রুত বিচার নিশ্চিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে মামলাটি পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে, যা পরে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে কার্যকর হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, শুধু কঠোর আইন থাকলেই কি এমন অপরাধ কমে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, রামিসা হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। 

প্রায়ই শিশু ও নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা ও সহিংসতার ঘটনা সামনে আসে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনমনে ক্ষোভের বিস্ফোরণ কয়েক দিনের মধ্যে স্তিমিত হয়ে যায়, আর মামলাগুলো দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার ভেতরে হারিয়ে যায়। এই বাস্তবতাই অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী মনজিল মোরশেদ মনে করেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ঘাটতি দৃশ্যমান ও দ্রুত বিচারের অভাব। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, বিচার হয়তো শেষ পর্যন্ত হয়, কিন্তু ১০ বা ২০ বছর পরে হওয়া বিচার সমাজে প্রতিরোধমূলক বার্তা তৈরি করতে পারে না। মানুষের স্মৃতি থেকে ঘটনা মুছে যাওয়ার পর সেই বিচার কার্যকর শিক্ষা হয়ে ওঠে না।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত কমপক্ষে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও অন্তত ৪৬ শিশু। একই সময়ে ধর্ষণ-পরবর্তী বা ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে অন্তত ১৭ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে।

মনজিল মোরশেদ বলেন, ধর্ষণ রুখতে শুধু আইন কঠোর করলেই অপরাধ কমবে না; বরং বিচার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একজন তদন্ত কর্মকর্তার ওপর অতিরিক্ত মামলার চাপ থাকলে তিনি কোনো মামলাই যথাযথভাবে তদন্ত করতে পারেন না। ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষ্যগ্রহণ ও আলামত সংগ্রহ, সবকিছুই সময়সাপেক্ষ। কিন্তু অপরাধ বাড়লেও তদন্ত কাঠামো, জনবল ও বিচারিক সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়ছে না। 

ফলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, সমাজের নৈতিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অনিয়মের সংস্কৃতিও অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে। রাষ্ট্র যখন আইনের শাসনের জায়গায় দুর্বলতা দেখায়, তখন অপরাধীরা মনে করে তারা পার পেয়ে যেতে পারে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের সামাজিক আচরণেও এক ধরনের সহিংসতা ও ক্ষমতার প্রদর্শন বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন মনজিল মোরশেদ। তিনি বলেন, সমাজে এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছে শক্তি যার, ক্ষমতা তার। এই প্রবণতা বিভিন্ন স্তরে আইন ও শৃঙ্খলার ভাঙনকে আরও উসকে দিয়েছে। 

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের অপমান, আদালত ও পেশাজীবীদের ওপর চাপ, বাড়িতে ঢুকে হামলা কিংবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের হেনস্থার মতো ঘটনার মধ্য দিয়ে এক ধরনের মব কালচার স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যার যেখানে ক্ষোভ, সেটিই উগড়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এর প্রভাব শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং অপরাধপ্রবণতাও এতে উৎসাহ পাচ্ছে।

মনজিল মোরশেদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলতে থাকলে সমাজে বিশৃঙ্খলার সংস্কৃতি আরও গভীর হয়। সেই প্রভাব সমাজ দীর্ঘ সময় ধরে বহন করে এবং এর প্রতিফলন অপরাধপ্রবণতার মধ্যেও দেখা যায়।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অনারারি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও মানবাধিকার কর্মী সারা হোসেন মনে করেন, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা বোঝার ক্ষেত্রেও তথ্যের ঘাটতি বড় সমস্যা। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, কতগুলো ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা রিপোর্ট হচ্ছে, কতগুলো মামলা হচ্ছে, তদন্ত শেষ হতে কত সময় লাগছে কিংবা কোথায় চার্জ গঠন আটকে যাচ্ছে, এসব তথ্য জনসমক্ষে খুব কম আসে। 

ফলে নীতিনির্ধারণ ও সংস্কারের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়। সারা হোসেন বলেন, ভিকটিম সুরক্ষার অভাব বিচারপ্রক্রিয়ার বড় বাধাগুলোর একটি। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণ বা সহিংসতার শিকার নারী ও শিশু বেঁচে থাকলেও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা মামলা চালিয়ে যেতে পারেন না। ভয়ভীতি, সামাজিক চাপ ও পাল্টা হুমকির কারণে অনেকেই শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যান।

ডিজিটাল, ফরেনসিক ও মেডিকেল-লিগ্যাল অ্যাভিডেন্স সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বড় দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, অপরাধের বৈজ্ঞানিক তদন্ত নিশ্চিত না হলে আদালতে শক্তিশালী মামলা দাঁড় করানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সম্প্রতি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আনা সংশোধনীগুলোকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। 

তার ভাষায়, তদন্ত প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর কমানো এবং আইনি দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে এসব সংশোধনীতে।

সারা হোসেন মনে করেন, রামিসা হত্যাকাণ্ড একটি দৃষ্টান্তমূলক মামলা হয়ে উঠতে পারে। যদি এই মামলায় আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয় এবং বিচার কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়, তা হলে অতীতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে শুধু বিচার ও শাস্তির ওপর জোর দেওয়ার প্রবণতারও সমালোচনা করেন সারা হোসেন। তার মতে, ভয়াবহ কোনো ঘটনা ঘটলেই সমাজে দ্রুত মৃত্যুদণ্ড বা কঠোর শাস্তির দাবি ওঠে; কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধে কী ধরনের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেই আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম হয়।

তিনি বলেন, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আদালত বা পুলিশ নয়, সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভিকটিম ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা, চিকিৎসা, সাক্ষী সুরক্ষা এবং তদন্তের প্রতিটি ধাপ কার্যকর নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। বিশেষ করে বিচার শুরুর আগের সময়টাকেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

সারা হোসেনের মতে, আইনে সময়সীমা নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে তা পর্যবেক্ষণ করা হয় না। তদন্ত বিলম্বিত হয়, সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষ্য দিতেও আসেন না। এটিকে তিনি মামলার দুর্বলতার প্রমাণ নয়, বরং নিরাপদ বিচারিক পরিবেশের অভাবের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল কঠোর শাস্তির ঘোষণা নয়; নিশ্চিত ও দ্রুত বিচার, দক্ষ তদন্ত, কার্যকর ফরেনসিক অবকাঠামো, ভিকটিম সুরক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা, সবকিছু একসঙ্গে কার্যকর হলেই এমন অপরাধ কমানো সম্ভব। অন্যথায় প্রতিবারই কোনো ভয়াবহ ঘটনার পর ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বিচার দাবির পুনরাবৃত্তি হবে, কিন্তু সমাজের গভীর সংকট অমীমাংসিতই থেকে যাবে।

/কেএইচও


  বিষয়:   ধর্ষণ  ভিকটিম সুরক্ষা  সামাজিক প্রতিরোধ  বিশেষজ্ঞ মত 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: