চলতি বছরের সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। সে লক্ষ্য সামনে রেখে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ও দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের বিধান বাতিল হলেও এরই মধ্যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এতে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে ইসি। যদিও সংশ্লিষ্ট দলগুলোর দাবি, তারা আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন দেয়নি; কেবল প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
তবে নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে প্রকাশ্যে নয়, গোপনভাবেও সমর্থন দিতে পারত। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলোর সম্পৃক্ততার সীমা কোথায়- সেটিও আইনে স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
গত ১৯ মে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের প্রধান পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
তিনি বলেন, আমরা আশা করছি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাস থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারব।
নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হচ্ছে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে নয়, এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি ইতিমধ্যে বিভিন্ন জেলা ও সিটি করপোরেশনে নিজেদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা শুরু করেছে। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার আগেই আগাম প্রচার ও প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করেছে তারা।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে গত ১০ মে প্রথম ধাপে ১০০ জন প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তালিকা ঘোষণা করেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক ও প্রধান সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম।
ঘোষিতদের মধ্যে ৩৪ জন পৌর মেয়র পদে এবং বাকি ৬৬ জন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। দলের কাছে জমা পড়া এক হাজারের বেশি আবেদন যাচাই-বাছাই করে এ তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়। দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০০ জনের নাম ঘোষণার পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা সময়ের আলোকে বলেন, দল হিসেবে দাঁড়াতে গেলে প্রার্থীদের পরিচিত হতে হয়। তাই আমরা দলীয়ভাবে সমর্থন জানিয়েছি। ঘোষিত প্রার্থীরা আমাদের মনোনীত নন, সমর্থিত প্রার্থী।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নির্বাচনব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ও দলীয় প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার মধ্যেও রাজনৈতিক দলগুলো জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিজেদের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা শুরু করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, দল থেকে অলরেডি মনোনয়নের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। এটা আমার কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। যদি সবাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হতো, তা হলে দলের মালিকানার বিষয়টি থাকত না। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যে বসে বিষয়টির একটা ফয়সালা করা।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং। এ নির্বাচনে রক্তপাত বন্ধ করাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য। ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংঘাতের ঘটনা বেশি হয়েছে। অনেক জায়গায় শুধু প্রাণহানি নয়, বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত হয়েছে। এ পরিস্থিতি থামাতে হবে। আমরা রক্তপাতহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাই, এ জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম সময়ের আলোকে বলেন, দলীয় সমর্থন গোপনেও দেওয়া যায়। কিন্তু এত প্রকাশ্যে করা ঠিক হচ্ছে না। কারণ যারা এ ঘোষণা দিচ্ছেন তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আছেন এবং পরিচিত মুখ।
তিনি বলেন, দলীয় সমর্থনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক- দুই ধরনের প্রভাবই থাকতে পারে। সমর্থন না দিলে এক জায়গায় একাধিক প্রার্থী দাঁড়াতে পারেন, ফলে নিজেদের মধ্যে সংঘাত বাড়তে পারে। আবার সমর্থন দিলে একজন প্রার্থীর পক্ষে দলের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহিংসতা বাড়াতেও পারে। তখন প্রার্থী নিজেকে ক্ষমতাধর ভাবতে পারেন এবং দলের প্রভাবও কাজে লাগতে পারে।
আইনি দিক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এ বিশ্লেষক। তার ভাষায়, রাজনৈতিক দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কতটুকু পর্যন্ত সম্পৃক্ত হতে পারবে- এ বিষয়ে আইনের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। এখানে একটা অস্পষ্টতা ও দুর্বলতা রয়ে গেছে। দল কতটুকু ইনভলভ হতে পারবে, কীভাবে সমর্থন দেবে- সেটা পরিষ্কার হওয়া দরকার ছিল।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় সরকারের প্রায় সব নির্বাচনেই সহিংসতার নজির রয়েছে। ২০১৬ সালে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চালু হওয়ার পর সহিংসতা আরও বেড়ে যায়। এখন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া আমি ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখি। তবে নির্বাচন সহিংসতামুক্ত রাখতে সরকারি দলের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের পর রাজনৈতিক সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বিশেষ করে ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে। নির্বাচন কমিশন ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্য মতে, ওই নির্বাচনে ২৩৬ জন নিহত এবং আট হাজারের বেশি মানুষ আহত হন।
এরপর ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে কয়েক ধাপে সংঘর্ষ ও সহিংসতায় প্রায় ১১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর আগে ২০০৩ সালের নির্বাচনে নিহত হন ২৩ জন এবং ২০১১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিহত হন ১০ জন। বিশ্লেষকদের মতে, আধিপত্য বিস্তার, প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরোধ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতাই এসব সহিংসতার প্রধান কারণ।
বর্তমানে স্থানীয় সরকারের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৬১টি জেলা পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা এবং ১৩টি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
/কেএইচও