আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও নিরপেক্ষ, সাশ্রয়ী ও সহিংসতামুক্ত করতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কাগজের পোস্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাতিল করা হচ্ছে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা ও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের বিধান। নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে, ফলে কোনো দলীয় প্রতীকও থাকছে না।
সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। তিনি বলেন, নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সহিংসতামুক্ত করতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিধিমালায় বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের বর্তমান নিয়ম বাতিল করা হবে। একইভাবে ইভিএম ব্যবহারের বিধানও থাকছে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে এবং কোনো দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না। বর্তমানে নির্দলীয় প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটিও বাতিল করা হচ্ছে। এ ছাড়া উপজেলা নির্বাচন ছাড়া স্থানীয় সরকারের অন্যান্য সব স্তরের নির্বাচনে জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কী পরিমাণ বাড়ানো হবে, তা এখনো নির্ধারণ হয়নি।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রবাসী ভোট বা পোস্টাল ভোটের কোনো ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। একই সঙ্গে ফেরারি আসামিরাও নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। বিশেষ করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনের মামলায় চার্জশিটভুক্ত কেউ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
তিনি বলেন, নির্বাচনকে নিরপেক্ষ, অবাধ, সুন্দর ও সুষ্ঠু করতে বিধিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কাজ চলছে। ঈদের পর সংশোধিত বিধিমালা চূড়ান্ত করে আগামী জুন মাসের মধ্যেই পুরো বিধি প্রণয়নের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। কমিশন আশা করছে, আগামী অক্টোবর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে শুরু হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচন শুরু হতে পারে। কমিশন অক্টোবর থেকেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার।
প্রথমত, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি বলেন, সরকার কী চায় এবং তাদের অবস্থান কী-সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য সরকারকে অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব। তারা কি সংঘাতের পথে যাবে, নাকি দেশের স্বার্থে দায়িত্বশীল আচরণ করবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, নির্বাচনে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সংঘর্ষ নয়।
তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের আপসহীন অবস্থান। তিনি বলেন, ইসি নিরপেক্ষ থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও কমিশনের নিজস্ব শক্তি সীমিত, তবুও নীতি ও দৃঢ়তার জায়গা থেকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, যাতে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া সুষ্ঠু থাকে।
চতুর্থত, নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ। তিনি বলেন, লাখ লাখ মানুষ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন। একজন প্রিসাইডিং অফিসার যদি আন্তরিকভাবে বলেন, ‘জাল ভোট করতে দেব না’ বা ‘দুই নম্বর কাজ হবে না’, তাহলে সেটি তার সততা, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে।
তিনি আরও বলেন, নিজের সততার শতভাগ প্রয়োজন, পাশাপাশি নেতৃত্বের সক্ষমতাও থাকতে হবে।
সহিংসতাহীন ও সুষ্ঠু স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে তিনি বলেন, এজন্য সরকারের শতভাগ সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিক সমর্থন প্রয়োজন। সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারের স্বার্থেই সেই নিরপেক্ষতা বজায় রাখা উচিত।
তিনি বলেন, সহিংসতা মূলত আইন-শৃঙ্খলার বিষয়। কেউ সংঘর্ষ সৃষ্টি করলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তি হবে। তবে শুধু আইনের কঠোর প্রয়োগ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোরও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে।
তার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হলেও বাস্তবে প্রার্থীরা রাজনৈতিক সমর্থন পেয়ে থাকেন। কোনো দলের সমর্থিত প্রার্থী মাঠে নামলে অন্য পক্ষ থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী দাঁড়ান। এ অবস্থায় দলগুলোর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি না থাকলে এবং তারা নিজেরাই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট হয়।
তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোকে দলগতভাবে অনুরোধ জানানো হবে যাতে তারা নির্বাচনী পরিবেশ উত্তপ্ত না করে এবং মারামারি, ভাঙচুর, ধাক্কাধাক্কি বা লাঠালাঠি থেকে বিরত থাকে। একই সঙ্গে দলবাজি বা উত্তেজনা তৈরির চেষ্টাও না করার আহ্বান জানানো হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সহযোগিতা না করলে আমরা কী করব? খেলোয়াড় যদি সারাদিন ফাউল করে, রেফারি কয়টা ফাউল ধরবে?
তিনি আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দুটি রাজনৈতিক জোট আচরণবিধি মেনে চলেছে। ভোটের দিন বড় ধরনের ঝামেলা, কেন্দ্র দখল বা ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা খুব কম হয়েছে। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কৃতিত্ব দেওয়া উচিত।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। রিটার্নিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং স্টাফরা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারচুপির প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি জানান, প্রয়োজনে ভোটকেন্দ্র বন্ধ করার ক্ষমতাও আইন ও বিধিমালায় রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সবশেষে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে বলে নির্বাচন কমিশন আশা করছে।
আরবিএন