ক্ষমতাসীন দল বিএনপি তার মিত্র শরিকদের নিয়ে বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। একসময় ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে থাকা শরিক দলগুলোর সঙ্গে ঈদুল আজহার পর বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠক করবেন। বৈঠকের খবরে শরিকরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, যেভাবে তারা বিএনপির সঙ্গে রাজপথে আন্দোলন করেছেন, একইভাবে এখন সরকারের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনায়ও সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন। এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সেই সুযোগই চাইবেন বিএনপির মিত্ররা। এ ছাড়া আলোচনায় উঠে আসতে পারে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের সফলতা ও ব্যর্থতার প্রসঙ্গ। একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশে সব ধরনের অরাজকতা মোকাবিলায় সবাইকে এক থাকার ব্যাপারে বৈঠকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
বিএনপি ও শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত শরিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বসেনি বিএনপি। যদিও নির্বাচনের আগে যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীদের নিয়ে ধারাবাহিক বৈঠক করেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলটির শীর্ষ নেতারা।
তিন বছর আগে বিএনপির নেতৃত্বে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে প্রায় অর্ধশত দল যুক্ত ছিল। সংসদ নির্বাচনে শরিকদের বিভিন্নভাবে ডজনখানেক আসন ছেড়ে দেয় বিএনপি। এর মধ্যে সরকারে রয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চের গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)।
আরও পড়ুন
আসন ছাড় পেলেও ভোটে হেরে যান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের চার প্রার্থী। সংসদে যেতে ব্যর্থ হন আরও কয়েকজন পরিচিত শরিক নেতাও। শরিকদের মধ্যে জয় পান মাত্র তিনজন, যারা নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। তারা হলেন- গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ। এর মধ্যে জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুর বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। অন্যদিকে নিজ দল এনডিএম ছেড়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ববি হাজ্জাজ।
শরিকদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি অনেকটা ‘একলা চলো’ নীতি অনুসরণ করছে। নির্বাচনের পর যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের প্রত্যাশা ছিল তাদের পরিবারের সদস্যদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটিও হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন বিএনপির হাইকমান্ড তারেক রহমান।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার। বিএনপির সমর্থন পেয়েও তিনি পরাজিত হন। সময়ের আলোকে মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, ‘শুনতে পাচ্ছি, ঈদের পর আমাদের নিয়ে বসবেন তারেক রহমান।
বিএনপির সঙ্গে আমাদের লড়াই দীর্ঘদিনের। রাজপথ থেকে শুরু করে সবখানে আমরা একসঙ্গে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। আমরা মনে করি, এই লড়াই এখনও চলমান। এই আন্দোলন যেন আরও পুনর্জীবিত ও সুসংহত হয়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। একই সঙ্গে আমরা সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চাই। দেশের জন্য কাজ করার পরিবেশ ও সুযোগ চাই। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে আমরা এসব বিষয় তুলে ধরব।’
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘শুনছি প্রধানমন্ত্রী আমাদের ডাকবেন, সম্ভবত ঈদের পরে। মিত্র শরিক হিসেবে অবশ্যই আমরা সেই ডাকে সাড়া দেব। শরিকদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, সে বিষয়গুলো তুলে ধরব। আমরা চাই, গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে এবং সরকারের গণতান্ত্রিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে।’
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের শীর্ষ নেতা ও ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের ডাকতে পারেন বলে শুনছি। বৈঠকের সিদ্ধান্ত হলে আমরা জোটগতভাবে আলোচ্য বিষয় নির্ধারণ করব। বিরোধী দলে থাকাকালে আমরা কী করেছি এবং এখন বিএনপি কী করছে- এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক নেতা ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, ঈদের পর সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য প্রধানমন্ত্রী আমাদের নিয়ে বসতে পারেন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এবং সরকারের তিন মাসের কার্যক্রম, সফলতা ও ব্যর্থতা- এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। প্রয়োজন হলে আমরা জোটগতভাবে কিছু প্রস্তাবও দেব। দেশে পরিচালনায় সরকার যাতে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেন।’
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমি জানি না এমন কোনও বৈঠক হবে কি না। সিদ্ধান্ত হলে তখন বিস্তারিত বলা যাবে। আমার সঙ্গে বিএনপির এ বিষয়ে কোনও কথা হয়নি।’
তবে শরিক দলের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই বৈঠক খুব বিশেষ কিছু নয়। আগে যেমন ড. ইউনূস যমুনায় বা শেখ হাসিনা গণভবনে ১৪ দলের সঙ্গে বৈঠক করতেন, এটিও তেমনই একটি নিয়মিত রাজনৈতিক বৈঠক বলে মনে হয়।’
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, সমমনা জোট, গণঅধিকার পরিষদ, গণফোরামসহ শরিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর শীর্ষ নেতারা বৈঠকে অংশ নেবেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা তো সবসময়ই তাদের সঙ্গে বসি। ঈদের আগেও বসতে পারি, পরেও বসতে পারি। শরিক দল তো একটি নয়, অনেকগুলো। সবার সঙ্গে বসতে সময় লাগে। যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলমান রয়েছে।’
এদিকে নির্বাচনের আগে তারেক রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে জোটের বেশ কয়েকজন নেতা নিজ দল বিলুপ্ত করে বা পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন। কিন্তু যোগদানের প্রায় চার মাস পরও তাদের অনেকেই কোনও দলীয় পদ বা দায়িত্ব পাননি। তাদের কেউ কেউ ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন, আবার অনেকে পরাজিত হয়েছেন। যারা হেরে গেছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আশা করছেন- বিএনপি তাদের মূল্যায়ন করবে, উচ্চকক্ষে সদস্য করা হবে কিংবা দলে সম্মানজনক পদ দেওয়া হবে।
দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েও ভালো নেই যারা
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিএনপির সদস্য ফরম পূরণ করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন সাত নেতা। তারা হলেন- এলডিপির সাবেক মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমদ, গণফোরামের সাবেক মহাসচিব ড. রেজা কিবরিয়া, এলডিপির (একাংশ) সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম, সৈয়দ এহসানুল হুদা, এনডিপির সাবেক চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান।
তাদের মধ্যে হবিগঞ্জ-১ আসনে রেজা কিবরিয়া, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে শাহাদাত হোসেন সেলিম এবং ঢাকা-১৩ আসনে ববি হাজ্জাজ ধানের শীষ প্রতীকে জয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
এ ছাড়া বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক আবু সাইয়িদ, যদিও তিনি নির্বাচনে অংশ নেননি। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিলেও নির্বাচনে জয় পাননি। গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানও পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন, কিন্তু তিনিও নির্বাচনে পরাজিত হন। এখনও বিএনপিতে তাদের কোনও সাংগঠনিক অবস্থান নির্ধারিত হয়নি।
এএডি/