গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সুরক্ষা এবং তা সচল রাখার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম একটি অপরিহার্য উপাদান। যাকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে গণমাধ্যমের প্রধান ভূমিকা হলো জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা, কারণ সঠিক তথ্য ছাড়া নাগরিকরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে না এবং নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। গণমাধ্যম সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর কড়া নজরদারি রেখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবানদের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
সেই সঙ্গে অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতার মাধ্যমে নানা দুর্নীতি ও অনিয়ম জনসমক্ষে নিয়ে আসে। এটি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ ও দাবি-দাওয়া সরকারের কাছে পৌঁছে দিয়ে জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে মুক্ত আলোচনা ও গঠনমূলক বিতর্কের পরিবেশ তৈরি করে জনমত গঠনে সাহায্য করে।
এর পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত, সংখ্যালঘু ও দুর্বল শ্রেণির ওপর হওয়া অন্যায়ের খবর প্রকাশ করে গণমাধ্যম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করে। সামগ্রিকভাবে, রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে একটি স্বৈরাচারমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মুক্ত গণমাধ্যম ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্র কখনোই পূর্ণতা পায় না।
সময়ের আলোর ৭ম বর্ষপূতিতে গণমাধ্যম বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। কথা বলেছেন গণমাধ্যম কমিশন গঠন, সর্বসম্মত নীতিমালা তৈরি, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করা, ওয়েজবোর্ড, গুজব প্রতিরোধসহ নানা বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি রফিক রাফি
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হিসেবে দেশে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ গঠনে আপনার মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় অবদান কোনটি হবে বলে আপনি মনে করেন?
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী : গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারকে এক মঞ্চে জড়ো করে তাদের সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা মতামতের ভিত্তিতে সর্বসম্মতিক্রমে একটা গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা এবং এ বিষয়ে সর্বসম্মত নীতিমালা তৈরি করাই হবে আমার মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় কাজ এবং যে লক্ষ্যে আমরা ইতিমধ্যে অনেক কাজে এগিয়ে আসছি।
গণমাধ্যম কমিশন গঠন কবে নাগাদ হতে পারে?
গণমাধ্যমকে সমন্বিত রেগুলেশনের মধ্যে রাখতে শিগগিরই গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা হবে। নির্বাচনি ইশতেহারে ও বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচিতেও এটি বলা হয়েছে। সেই লক্ষ্যে আমরা আগাব। অগ্রগতি হচ্ছে, সব অংশীজনই এখন এই লক্ষ্যের সঙ্গে যৌথ যাত্রার মধ্যে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পরামর্শক কমিটি গঠন করে একটি খসড়া প্রস্তাব সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হবে। আগামী জুলাইয়ের মধ্যে সরকারের কাছে এই প্রস্তাব দেওয়া সম্ভব হবে।
গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। রাষ্ট্রের অন্যান্য স্তম্ভকে জনগণের কাছে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে গণমাধ্যম কমিশন গঠন শুধু সরকারের একক বিষয় নয়; এটি সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সম্মিলিত উদ্যোগ। সরকার একদিকে যেমন এ প্রক্রিয়ায় সমান অংশীদার হিসেবে কাজ করবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সমন্বয়কারী ও ব্যবস্থাপকের দায়িত্বও পালন করবে।
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করতে তথ্য মন্ত্রণালয় কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে?
ইতিমধ্যেই সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে মালিক পক্ষের ওয়েজবোর্ডের বাইরে থাকা এবং মালিকানা চর্চার ক্ষেত্রে নিয়মনীতি বা বিধিবিধানের মধ্যে না থাকাকেই তারা দায়ী করেছেন। সাংবাদিকদের এই মন্তব্যকে আমরা বিবেচনায় নিয়েই গণমাধ্যম কমিশনের নীতিমালা গঠন করব।
গণমাধ্যম যাতে কোনো ধরনের চাপ বা ভয় ছাড়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারে- এটা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেবেন কি না?
আমরা ইতিমধ্যেই গণমাধ্যম কমিশন গঠন করার ক্ষেত্রে সর্বমহলের যে অংশগ্রহণ সম্পন্ন করতে পেরেছি, তার আলোকে যখনই আমরা একটা কমিশন গঠন করে ফেলতে পারব; আমরা মনে করি তখনই প্রতিষ্ঠান গঠন করার কাজটাকে আমরা সম্পন্ন করতে পারব।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের মধ্যে যে উদ্যোগ ছিল সেটা নিরসন এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ সুগম করতে আপনার পরিকল্পনা কী?
আসলে এসব বিষয় আমরা গণমাধ্যম কমিশন গঠিত হওয়ার পরে তাদের হাতে ছেড়ে দেব।
অপসাংবাদিকতা এবং ভুয়া যেসব নিউজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আছে গুজব ছড়াচ্ছে- এটা নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?
গণতান্ত্রিক সরকার হিসেবে জনগণকে অপতথ্যের হাত থেকে বা গুজবের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়াটাও আমাদের একটা দায়িত্ব। ফলে একদিকে যেমন আমরা সংবাদ প্রবাহের অবাধ স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করব অন্যদিকে তেমনি অপতথ্যের হাত থেকে জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কঠোর আইনও করব।
বর্তমানে কার্ডধারী সাংবাদিকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে কিন্তু পেশাদার সাংবাদিকতার মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে, সরকার কি সাংবাদিকতার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পেশাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করার উদ্যোগ নেবে?
গণমাধ্যম জগতে যেহেতু আরও অনেক অংশীদার আছে তারা সবাই মিলে অবশ্যই এ রকম একটি মহান পেশার সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে এবং তাদের পেশাদারিত্বের সীমানা নির্ধারণ করবে বলে আমরা আশা করছি। যার যার স্বার্থে সরকার ও মালিক পক্ষের গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগে একটি অপসাংবাদিকতা চলে।
বিএনপি একটি নির্বাচিত সরকার। আমাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা পথ চলছি। ফলে এখন পর্যন্ত গণমাধ্যম কমিশনের চেয়ারম্যান প্রশংসা করেছেন। এর আগে মালিক সমিতি ও সম্পাদকরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে প্রশংসা করে এসেছেন। আমরা এই প্রশংসা ধরে রাখার চেষ্টা করব।
পত্রিকার সার্কুলেশন বা প্রচার সংখ্যা নিয়ে অসত্য তথ্যের অভিযোগ রয়েছে, তথ্য মন্ত্রণালয় সঠিক তথ্য প্রকাশে সচেষ্ট হবে কি না?
তথ্য মন্ত্রণালয় আর কোনো মিথ্যার কাঠামোর ওপর দাঁড়াবে না। আমরা একটি সঠিক ডিজিটাল টিআরপি সিস্টেম এবং ডিজিটাল প্রিন্ট কাউন্টিং ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছি। মনগড়া সংখ্যার ভিত্তিতে আর কোনো রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞাপনের সুযোগ-সুবিধা বণ্টন করা হবে না; যা বণ্টন হবে তা কেবল সত্য ও সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই হবে।
অনেকেই ওয়েজবোর্ড মানে না। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে সুবিধা নিচ্ছে- অনেক সময় কর ফাঁকি দেওয়া কিংবা অন্যত্র অবৈধ আয় পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গণমাধ্যমের মালিকানা নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো উদ্যোক্তা যদি তার প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইন না মানেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওয়েজবোর্ড বা নিয়মিত বেতন-ভাতা ও অবসরকালীন সুবিধা নিশ্চিত না করেন এবং ট্যাক্স-ভ্যাট বা ব্যালেন্সশিটে স্বচ্ছতা না রাখেন, তবে তার লাইসেন্স পাওয়ার বা তা নবায়নের কোনো অধিকার থাকবে না।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে...
বিগত (অন্তর্বর্তী) সরকারে নাহিদ ইসলাম তথ্য উপদেষ্টা থাকার সময় মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি কয়েক দফায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে সাংবাদিকদের কাছ থেকে তথ্য আহ্বান করে। মোট ৯২ জন সাংবাদিক তাদের হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব মামলার বাদী সরকার নয়। ব্যক্তিগত বিরোধ থেকেও মামলা হয়েছে। আবার যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদের অনেকের পেশা সাংবাদিকতা নয়।
তিনি বলেন, তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনের পদে থেকে নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন, অনেকের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছেন। ভুক্তভোগীরা মামলা করেছে। কিন্তু ভুঁইফোড় মিডিয়ার সাংবাদিক পরিচয় ধারণ করে সাংবাদিক হিসেবে কেউ কেউ সুবিধা নিতে চাচ্ছে। বিগত সরকারের অভিজ্ঞতাও আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।
/এসএকে