সংক্রমণের ‘পিক পয়েন্টে’ হাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

দেশে হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হওয়ায় গত ৭১ দিনে মোট

2026-05-26T00:47:04+00:00
2026-05-26T00:47:04+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
সংক্রমণের ‘পিক পয়েন্টে’ হাম
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ১২:৪৭ এএম   (ভিজিট : ২৪)
সংগৃহীত ছবি
দেশে হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছেই। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হওয়ায় গত ৭১ দিনে মোট প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪৫ জনে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ৭২ হাজারের বেশি শিশু। এর মধ্যে ঈদ সামনে রেখে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত, গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভিড় এবং শিশুদের নিয়ে দূরপাল্লার ভ্রমণ নতুন করে সংক্রমণ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এখনই কার্যকর সতর্কতা ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ঈদের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঈদ কেন্দ্র করে মার্কেট, পশুর হাট, বাস-ট্রেন-লঞ্চসহ গণপরিবহনে বাড়তি ভিড় এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসার কারণে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে আক্রান্ত ও সুস্থ শিশুদের একসঙ্গে দীর্ঘসময় অবস্থান সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। তারা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় ভিড়পূর্ণ পরিবেশে একজন আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে অনেক শিশু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হাম রোগের ‘ইনকিউবেশন পিরিয়ড’ সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিন। ফলে ঈদের সময় সংক্রমিত হলেও তার প্রভাব ঈদের পরবর্তী সময়েও দেখা যেতে পারে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মানুষের ঈদযাত্রা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তারা অন্তত অসুস্থ শিশুদের ভ্রমণ না করানো এবং অপ্রয়োজনে শিশুদের নিয়ে ভিড়ে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমানে হাম সংক্রমণ এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যাকে ‘পিক পয়েন্ট’ বলা যায়। ঈদের সময় গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভিড় ও দীর্ঘ ভ্রমণের কারণে আক্রান্ত ও সুস্থ শিশুদের সংস্পর্শ বাড়বে, যা সংক্রমণ আরও বিস্তৃত করতে পারে। তিনি বলেন, ঈদের সময়ের চলাচলের প্রভাব ঈদের পরও অন্তত ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত থাকবে, কারণ হাম রোগের ইনকিউবেশন পিরিয়ডও একই সময়ের।

ডা. মুশতাকের মতে, এখন সংক্রমণ কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ঈদে বাড়ি যাওয়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ। সবার জন্য আলাদা পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষকে ভিড় এড়িয়ে চলতে বলা বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে গণপরিবহনের ভিড়ে আক্রান্ত শিশুরা যেমন ঝুঁকিতে পড়বে, তেমনি সুস্থ শিশুরাও সংক্রমিত হতে পারে।

তিনি অসুস্থ শিশুদের ঈদের আগে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, ভিড় কমে গেলে বা ঈদের পর যাত্রা করলে ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে শুধু ‘ভ্রমণ করবেন না’ ধরনের বার্তা দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, মানুষের যাতায়াতের সঙ্গে জীবিকা, পারিবারিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা জড়িত।

একই ধরনের সতর্কতা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেসব শিশু হাম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের অতিরিক্ত ভিড় বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে না নেওয়াই ভালো।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ঈদযাত্রার কারণে সংক্রমণ বাড়লে এর প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে শিশুমৃত্যুর হারও বাড়তে পারে। ডা. মুশতাক বলেন, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। সংক্রমণের পর গুরুতর অবস্থা তৈরি হতে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তার আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী এক মাসে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও অপুষ্টিজনিত জটিলতা দ্রুত বাড়ে। ফলে রোগী গুরুতর অবস্থায় পৌঁছালে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও চাপ বাড়বে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ, অক্সিজেন ও বিশেষায়িত সেবার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও সংকটময় করতে পারে।

ডা. মুশতাক মনে করেন, শুধু হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি কমিউনিটি পর্যায়ে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত, আলাদা রাখা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে হাই-ফ্লো অক্সিজেন ও শিশুদের উপযোগী চিকিৎসাব্যবস্থা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউও ব্যবহার করতে হতে পারে।

তিনি সরকারের বর্তমান পদক্ষেপকে ‘গতানুগতিক’ উল্লেখ করে বলেন, এখনও বড় হাসপাতাল ও আইসিইউকেন্দ্রিক চিন্তার বাইরে কার্যকর প্রস্তুতি গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় সরকার, নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, এনজিও এবং বেসরকারি খাত সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। মাঠপর্যায়ে সচেতনতা, নজরদারি ও দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে ঈদের পর শিশুস্বাস্থ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

এদিকে সোমবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে আর একটি শিশুর হামে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এ নিয়ে গত ৭১ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা ৫৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৫৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামে ৮৭ শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে যে ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে ৭ শিশুই ঢাকা বিভাগের। এ ছাড়া সিলেট বিভাগে তিনজন, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে দুজন করে এবং ময়মনসিংহে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

শেষ ২৪ ঘণ্টায় হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১২৭ জন। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৭ শিশু। তাদের মধ্যে ৪২৭ শিশুই ঢাকা বিভাগের। এরপর আছে চট্টগ্রাম (২০৮), বরিশাল (১২৮) ও খুলনা (৯৫)। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪০৫ জন হাসপাতাল থেকে ছুটিও পেয়েছে।

গত ১৫ মার্চ দেশে প্রথম হাম রোগী শনাক্ত হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত ৭১ দিনে মোট হাম রোগীর সংখ্যা ৬৪ হাজার ৯৪০। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৫৮৫ জন। মোট হাম শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৭১৯ জনের। এ ছাড়া ৭১ দিনে হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছে ৪৭ হাজার ৬১৯ জন।

আরবিএন 



Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: