টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর কুরবানির পশুর হাটগুলো কাদায় একাকার হয়ে পড়েছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় রাজধানীর ২৭টি স্থানে পশুর হাট বসেছে। তবে বৃষ্টির পানি, গোবরে হাটগুলোর বেশিরভাগ অংশ কর্দমাক্ত হয়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতা ও খামারিরা। দুর্ভোগে পড়েছে পশুগুলোও। তবু ঈদ সামনে রেখে হাটগুলোতে জমে উঠেছে কেনাবেচা।
গত কয়েক দিনের ভ্যাপসা গরমে পশুগুলো কষ্টে থাকলেও রোববার বিকাল থেকে সোমবারের টানা ভারী বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও হাঁটুসমান পানি জমেছে, কোথাও কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে গরু। অনেক জায়গায় পশুগুলোকে কাদার মধ্যেই শুয়ে থাকতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যবসায়ী ও খামারিরা খড় ও বালু ফেলছেন, তবে তাতেও পুরোপুরি স্বস্তি মিলছে না।
অন্যদিকে হাটে গরুর সরবরাহ বাড়লেও দাম নিয়ে এখনও অসন্তুষ্ট অনেক ক্রেতা। বিশেষ করে মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি থাকায় এসব গরুর দাম তুলনামূলক বেশি হাঁকা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। বেশিরভাগ মাঝারি গরু বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে। অনেক ক্রেতাই এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিভিন্ন হাট ঘুরে দাম যাচাই করছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের খামারে লালন-পালন করা গরুর চাহিদা বেশি। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় হাটে প্রাণচাঞ্চল্য রয়েছে। ঈদের আগের দুই-তিন দিনে কেনাবেচা আরও বাড়বে বলে তাদের আশা।
রাজধানীর দিয়াবাড়ী পশুর হাটে ছোট ও মাঝারি গরুর বিক্রি বেশি হচ্ছে। গরু কিনতে আসা জহির বলেন, ‘হাটে গরু আছে, তবে দাম কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে। আরও দুদিন দেখে তারপর কিনব।’
একই হাট থেকে গরু কিনে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মো. আব্দুল দিদার।
তিনি বলেন, ‘সাধ্যের মধ্যেই কুরবানির গরু কিনতে পেরে ভালো লাগছে।’
গরু কিনতে আসা শামীম জামান বলেন, ‘মাঝারি গরুর দাম বেশ চড়া। এখনও গরু আসছে, তাই (আজ) মঙ্গলবার পর্যন্ত দেখে তারপর কেনার সিদ্ধান্ত নেব।’
শাহজাহানপুর পশুর হাটে গরু দেখতে আসা জেসমিন বলেন, ‘মাঝারি গরুর দাম এখন ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। গত বছর একই ধরনের গরু ১ লাখ ৩০ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় পাওয়া গেছে।’
সিরাজগঞ্জ থেকে শাহজাহানপুর হাটে গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ী হজরত আলী বলেন, ‘২০টি গরু এনেছি। এর মধ্যে ৮টি বিক্রি হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টিতে হাটের অবস্থা খুব খারাপ। গরুগুলো পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। তবে ক্রেতারা আসছেন, দরদাম করছেন। আশা করছি ভালো দামে বিক্রি করতে পারব।’
কুষ্টিয়া থেকে আসা খামারি শুভ বলেন, ‘১৫টি গরু এনেছি। নিজের খামারে লালন-পালন করেছি। এখন পর্যন্ত মাত্র ৩টি বিক্রি হয়েছে। বৃষ্টিতে গরু রাখার জায়গা তলিয়ে গেছে। তারপরও আশা করছি ভালো দাম পাব।’
শেষ মুহূর্তে রাজধানীর গাবতলী পশুর হাটেও জমে উঠেছে কেনাবেচা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত ট্রাকে করে পশু এসেছে সেখানে। বর্তমানে মাঝারি আকারের গরুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। চার মণ ওজনের গরু বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায়।
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থেকে সাতটি গরু নিয়ে আসা খামারি মো. আব্দুর রোশন বলেন, প্রায় সাড়ে তিন মণ ওজনের একটি গরু তিনি ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। তবে কাক্সিক্ষত মাত্রায় কেনাবেচা এখনও শুরু হয়নি বলেও জানান তিনি।
প্রায় পাঁচ মণ ওজনের একটি গরু কিনেছেন মোহাম্মদ হানিফ। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে হাট ঘুরেও দাম কম পাইনি। শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৭৩ হাজার টাকায় গরু কিনেছি।’
মোহাম্মদপুর থেকে গরু কিনতে আসা রুহুল আমিন বলেন, ‘১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার মধ্যে গরু কিনতে চাই। সকাল থেকে ঘুরছি, কিন্তু বাজেটের মধ্যে এখনও পছন্দ হয়নি।’
৫৪ হাজার ৯৪২ টন বর্জ্য অপসারণের প্রস্তুতি : ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীতে প্রতি বছর প্রায় ১২ লাখ গবাদিপশু কুরবানি করা হয়। এ বছর ঈদের তিন দিনে মোট ৫৪ হাজার ৯৪২ টন বর্জ্য অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।
এর মধ্যে ডিএনসিসি এলাকায় প্রায় ২১ হাজার টন এবং ডিএসসিসি এলাকায় প্রায় ৩৩ হাজার ৯৪২ টন বর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসি জানিয়েছে, বর্জ্য অপসারণে প্রায় ১৬ হাজার কর্মী মাঠে কাজ করবেন। তাদের সহায়তায় থাকবে কেন্দ্রীয় ও জোনভিত্তিক মনিটরিং সেল। কুরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য ১৬ লাখ ৩০ হাজার পলিব্যাগ, ৩ হাজার ৬০০ বস্তা ব্লিচিং পাউডার, স্যাভলন ও অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাক, ডাম্পার, পে-লোডার, পানির গাড়িসহ মোট ৭৫২টি যানবাহন ব্যবহার করা হবে।
ডিএনসিসির উপপ্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান ভূঁইয়া জানান, সংস্থার নিজস্ব পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছাড়াও বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহকারী কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা মাঠে কাজ করবেন।
ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নগরবাসীর সহযোগিতা পেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বর্জ্যমুক্ত শহর উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।’
অন্যদিকে ডিএসসিসি ঈদের প্রথম দিনের বর্জ্য ৮ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তিন দিনে প্রায় ১৩ হাজার ৪৫৩ জন কর্মী বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করবেন। ইতিমধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার পচনশীল ব্যাগ, ৪০ টন ব্লিচিং পাউডার ও ১ হাজার ৫০ লিটার স্যাভলন বিতরণ করা হয়েছে।
ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘কুরবানির বর্জ্য কোনোভাবেই নালা-নর্দমা বা ড্রেনে ফেলবেন না। বৃষ্টি হলে এসব বর্জ্যে পানি আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। নগরী পরিষ্কার রাখতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’
আরবিএন