মুসলিম উম্মাহর অন্যতম ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা বাংলাদেশে ২৮ মে বৃহস্পতিবার উদযাপিত হবে। এই দিনটি হজরত ইবরাহিম (আ.) এর ত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত, যিনি আল্লাহর নির্দেশে পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানির জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। এ ঘটনার স্মরণে মুসলমানরা আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ, দুম্বা বা উট কুরবানি করেন, যা ইসলামে ওয়াজিব। ঈদুল আজহার মূল প্রতিপাদ্য হলো ত্যাগ ও আত্মসমর্পণ। মুসলিম উম্মাহ ফজরের নামাজের পর ঈদগাহে দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কুরবানি করেন। এই উৎসবের সঙ্গে পবিত্র হজের সম্পর্ক রয়েছে। আজ মঙ্গলবার মক্কার কাছে আরাফাতের ময়দানে প্রায় ১৫ লাখ হাজির সমবেত হওয়ার মধ্য দিয়ে হজ পালিত হচ্ছে।
আগামীকাল বুধবার সৌদি আরবে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে, যেখানে হাজিরা মুজদালিফা থেকে ফিরে মিনায় পশু কুরবানিসহ হজের অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন। প্রতিবারের মতো এবারও জাতীয় ঈদগাহে ঈদুল আজহার প্রধান জামাত হবে সকাল সাড়ে ৭টায়। তবে ঝড়-বৃষ্টির কারণে আবহাওয়া প্রতিকূল হলে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে হবে ঈদের প্রধান জামাত। সোমবার জাতীয় ঈদগাহ পরিদর্শন শেষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান। তিনি বলেন, ঈদগাহের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবর্গসহ সর্বস্তরের মানুষ এই জামাতে অংশগ্রহণ করবেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, ১২১টি কাতারে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারবেন। এর মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ (ভিআইপি) পুরুষ ২৫০ জন এবং নারী ৮০ জনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে প্রায় ৩১ হাজার পুরুষ এবং প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ৫০০ নারী মুসল্লির জন্য পৃথক নামাজের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ঈদগাহ ময়দানে প্রবেশের জন্য মোট ৪টি ফটকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে ভিআইপিদের জন্য ১টি, সাধারণ পুরুষ মুসল্লিদের জন্য ২টি এবং নারী মুসল্লিদের জন্য ১টি আলাদা প্রবেশ ফটক থাকবে। অন্যদিকে বহির্গমনের জন্য মোট ৭টি ফটক রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ভিআইপিদের জন্য ১টি, সাধারণ পুরুষ মুসল্লিদের জন্য ৫টি এবং নারীদের জন্য ১টি পৃথক বহির্গমন ফটক নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঈদ জামাতে সর্বমোট ১২১টি কাতারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ভিআইপি পুরুষদের জন্য ৫টি ও নারীদের জন্য ১টি কাতার, সাধারণ পুরুষ মুসল্লিদের জন্য ৬৫টি বড় আকারের কাতার এবং নারী মুসল্লিদের জন্য ৫০টি ছোট আকারের কাতার থাকবে। ওজুখানায় একসঙ্গে প্রায় ১৪০ জন মুসল্লি ওজু করতে পারবেন। এর মধ্যে পুরুষদের জন্য ১১৩ জন এবং নারীদের জন্য ২৭ জনের পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মুসল্লিদের সুবিধার্থে ঈদগাহ ময়দানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র, পর্যাপ্ত ফ্যান ও আলোর ব্যবস্থা, নিরাপদ খাবার পানি, নামাজের জন্য কার্পেট এবং ভিআইপি কাতারে জায়নামাজ সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া নারীদের জন্য পৃথক প্রবেশপথ ও নামাজ আদায়ের বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ঈদ জামাত কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, ভ্রাম্যমাণ টয়লেট, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি নিরোধক শামিয়ানার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ ছাড়া মুসল্লিদের আকর্ষণ করতে ঈদগাহে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ৩টি ফটক। আয়োজকরা জানিয়েছেন, মুসল্লিদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
জাতীয় মসজিদে ৫ জামাত : এদিকে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পবিত্র ঈদুল আজহার ৫টি জামাত অনুষ্ঠিত হবে।
ঈদের জামাতে ইমামতি ও মুকাব্বিরের দায়িত্ব পালনকারী আলেম ও সংশ্লিষ্টদের তালিকা চূড়ান্ত করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা)। এর আগে ইফার দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের পক্ষ থেকে এ তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।
সকাল ৭টার প্রথম জামাতে ইমামতি করবেন বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র পেশ ইমাম হাফেজ মাওলানা মুফতি মো. মিযানুর রহমান। মুকাব্বির হিসেবে থাকবেন মসজিদের মুয়াজ্জিন ক্বারি ইসহাক।
দ্বিতীয় জামাত সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে। ইমাম হিসেবে থাকবেন ফাউন্ডেশনের জাকাত ফান্ড বিভাগের পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) ড. মাওলানা ওয়ালীয়ূর রহমান খান। মুকাব্বিরের দায়িত্ব পালন করবেন মসজিদের চিফ খাদেম মো. নাসির উল্লাহ।
তৃতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ৯টায়। এতে ইমামতি করবেন ফাউন্ডেশনের মুফতি মো. আব্দুল্লাহ। মুকাব্বির হিসেবে থাকবেন মো. রুহুল আমিন। সকাল ১০টার চতুর্থ জামাতে ইমামতি করবেন ইফার দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাওলানা মোহাম্মদ নূর উদ্দীন। মুকাব্বিরের দায়িত্ব পালন করবেন মো. আব্দুল হাদী।
পঞ্চম বা সবশেষ জামাত সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে অনুষ্ঠিত হবে। এতে ইমামতি করবেন ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির ধর্মীয় প্রশিক্ষক জুবাইর আহাম্মদ আল-আযহারী। মুকাব্বির হিসেবে থাকবেন মো. আমির হোসেন।
কোনো জামাতে নির্ধারিত ইমাম অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প ইমাম হিসেবে ফাউন্ডেশনের সহকারী লাইব্রেরিয়ান মো. শহিদুল ইসলাম দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া বিকল্প মুকাব্বির হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মো. শামসুল হক।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সব ইমাম, মুকাব্বির এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নির্ধারিত সময়ের আগে জাতীয় মসজিদে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে উন্নত খাবার, মেট্রোরেল বন্ধ থাকবে: ঈদ উপলক্ষে দেশের হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশু সদন, বৃদ্ধ নিবাস, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোতে যথাযথভাবে ঈদ উদযাপিত হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো কুরবানির বর্জ্য দ্বারা পরিবেশ দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে সচেতনতার জন্য জুমার খুতবায় মুসল্লিদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানিয়েছে, ঈদের দিন মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ থাকবে। সরকারি ছুটির অন্য ছয় দিন মেট্রোরেল চালু থাকবে। ঈদের ছুটির দিনগুলোয় ১২ থেকে ১৫ মিনিট বিরতিতে (হেডওয়ে) মেট্রোরেল চলবে উল্লেখ করে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রী-চাপ অনুযায়ী ট্রিপসংখ্যা বাড়ানো বা কমানো হতে পারে। ঈদের পরদিন শুক্রবার উত্তরা উত্তর মেট্রোরেল স্টেশনে দুপুর ২টা ৪৫ মিনিট থেকে এবং মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনে বেলা ৩টা ৫ মিনিট থেকে একক যাত্রা টিকেট কেনা যাবে। একই সঙ্গে র্যাপিড পাস কেনা যাবে। ছুটির এই সময়ে রাত ৯টা ২০ মিনিটের পর মেট্রোরেলের সব-স্টেশনে টিকেট বিক্রি বন্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া সরকার ঈদের ছুটিতে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছে, যাতে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন হয়।
আরবিএন