নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধির চাপ থেকে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি দিতে ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর থেকে ক্রমান্বয়ে সরে আসার পরিকল্পনা করছে সরকার। এই লক্ষ্যে আসন্ন বাজেটে উচ্চবিত্ত ও ধনীদের সম্পদের ওপর সরাসরি প্রত্যক্ষ কর আরোপের বড় উদ্যোগ নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ‘এনবিআর’। নতুন এই সম্পদ কর খাত থেকে আগামীতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করদাতা, উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং সম্পত্তির মালিকদের করের আওতায় আনতে কঠোর নজরদারির পরিকল্পনা করেছে এনবিআর। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি, উত্তরা এবং চট্টগ্রামের খুলশীর মতো অভিজাত এলাকাগুলোতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিশেষ কর জরিপ চালানো হবে। অর্থনীতিবিদরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কর ব্যবস্থায় প্রকৃত ন্যায্যতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন।
বর্তমানে দেশে কোনো ব্যক্তির মোট সম্পদ ৪ কোটি টাকার বেশি হলে ন্যূনতম ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে সম্পদের পরিমাণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ আরোপ করে এনবিআর। তবে এই খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব না আসায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের খসড়া অনুযায়ী একটি নতুন কর কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে ৪ থেকে ৬ কোটি টাকার সম্পদের ওপর ০.২৫ শতাংশ, ৬ থেকে ১১ কোটির ওপর ০.৫০ শতাংশ, ১১ থেকে ১৬ কোটির ওপর ০.৭৫ শতাংশ এবং ১৬ কোটির বেশি সম্পদের ওপর ১ শতাংশ হারে সরাসরি সম্পদ কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই নতুন কর কাঠামোর ফলে কর আদায়ের পরিমাণে বড় পরিবর্তন আসবে। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির ১০০ কোটি টাকার সম্পদের বিপরীতে আয়কর ২০ লাখ টাকা হলে, সেখানে সর্বোচ্চ হারে সারচার্জ আসে মাত্র ৭ লাখ টাকা। কিন্তু নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ১ শতাংশ সরাসরি সম্পদ কর চালু হলে, ওই একই ১০০ কোটি টাকার সম্পদের ওপর করের পরিমাণ দাঁড়িয়ে যাবে ১ কোটি টাকা। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিগত ২০২২-২৩ অর্থবছরে সারচার্জ থেকে ৬৯৫ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬২৬ কোটি টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫৯৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ‘সিপিডি’ সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান সরকারের এই পরিকল্পনা প্রসঙ্গে বলেন, সারচার্জ প্রথা থেকে সরাসরি ওয়েলথ ট্যাক্স বা সম্পদ করে স্থানান্তরিত হলে কর ব্যবস্থা আরও সুনির্দিষ্ট হবে এবং এটি সমাজে বৈষম্য কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে শুধু রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বিদ্যমান নিয়মিত করদাতাদের ওপর নতুন করে চাপ বাড়ালে তা সঠিক হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মন্তব্য করেন, সম্পদ কর থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা খুব বড় অঙ্ক নয়। তবে এই কর আদায় করতে গিয়ে সরকারের নিজস্ব খরচ যেন আবার বেশি না হয়ে যায়, সেই অর্থনৈতিক দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে যেকোনো নতুন কর ব্যবস্থা চালুর আগে করদাতাদের এ বিষয়ে সচেতন করা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্য দিকে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী এই উদ্যোগ নিয়ে ভিন্ন মত প্রকাশ করে বলেন, যারা নিয়মিত কমবেশি রিটার্ন দিচ্ছেন, কেবল তাদেরই বারবার নজরদারিতে ধরা হচ্ছে। অথচ যারা কর দিচ্ছেন না, তাদের সেভাবে খোঁজা হচ্ছে না। এভাবে করের বোঝা চাপানো ঠিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা এমনিতেই কর ও ঋণের চাপে আছেন, এভাবে চলতে থাকলে তারা একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবেন।
সময়ের আলো/টিএইচ