সংগৃহীত ছবিমহান স্বাধীনতার ঘোষক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুল আলোচিত ঐতিহাসিক নিবন্ধ ‘একটি জাতির জন্ম’ পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা ও ইতিহাসবিদসহ বিশিষ্টজনরা।
এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন।
৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী। এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখে তার জীবন-কর্ম এবং জাতিগঠনে অসামান্য অবদান নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে এই দাবি উঠেছে। ঐতিহাসিক এই নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় এবং পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় এটি পুনর্মুদ্রণ করা হয়।
বাংলা একাডেমির সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এই নিবন্ধটিকে একটি অনন্য ‘ঐতিহাসিক দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করে এটি দ্রুত পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার তাগিদ দিয়েছেন। তার সঙ্গে পূর্ণ একমত পোষণ করে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ১৯৭১ সালের মূল ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য এই নিবন্ধটি পাঠ্যপুস্তকের অংশ হওয়া জরুরি, কারণ দিন দিন মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ম্লান হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট কূটনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী জানান, সম্পূর্ণ তথ্যবহুল এই নিবন্ধে কোনো বিভ্রান্তিকর উপাদান নেই এবং এটি ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ সম্পর্কিত যেকোনো শিক্ষাক্রমের অংশ হতে পারে। এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইসরাফিল বলেন, ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে নতুন প্রজন্মের এই বাস্তব ইতিহাস জানা উচিত, কারণ এতে মুক্তিযুদ্ধের শুরুর পটভূমি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
নিবন্ধটি রচনার সময় মেজর জেনারেল পদমর্যাদার জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরুর পরপরই অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে তিনি চট্টগ্রামে বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসকে ‘বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা দিন’ আখ্যা দিয়ে নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, তিনি ব্যাটালিয়নের অফিসার ও জওয়ানদের সংক্ষেপে সব বুঝিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার নির্দেশ দিলে তারা হৃষ্টচিত্তে তা মেনে নেয়। এরপর তিনি সেনাদের নিয়ে কালুরঘাট এলাকায় যান এবং সেখানকার গোপন ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
স্মৃতিচারণমূলক এই লেখায় জিয়াউর রহমান পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক দমন-পীড়ন, দীর্ঘ সামরিক শাসনের ভয়াবহতা এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত প্রধান প্রধান রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর বিবরণ দেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৪৮ সালে ঢাকার মাটিতে দাঁড়িয়ে জিন্নাহর ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার দিন থেকেই মূলত বাঙালিদের হৃদয়ে জাতীয়তাবাদের বীজ বপন হয়েছিল এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই সেদিন এই অস্বাভাবিক দেশটির ধ্বংসের বীজ বুনে দিয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমান তার নিবন্ধে আরও স্পষ্ট করেন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তিলাভের ঘটনাটি বাঙালি সামরিক সদস্যদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব ঐক্য ও বেসামরিক জনগণের সঙ্গে সংহতি গড়ে তুলেছিল।
পরবর্তীতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর পাকিস্তানি জান্তার ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা ও ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটেই রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আসে, যা বাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে চূড়ান্ত পরিকল্পনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করেছিল।
অনলাইনে সহজলভ্য এই ঐতিহাসিক নিবন্ধের রচয়িতা ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন, একদলীয় বাকশাল শাসন বাতিল করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন এবং ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্ব ও বহু-সাংস্কৃতিক নাগরিকত্ব ধারণ করে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর প্রবর্তন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়ের আলো/টিএইচ