নিজের মাথা গোঁজার একমাত্র বসতবাড়ি বিক্রি করে জীবনের সমস্ত উপার্জনে প্রায় ২০ লাখ বইয়ের এক সুবিশাল লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন ভারতের কর্নাটক রাজ্যের মাণ্ড্য জেলার এক প্রাক্তন বাস কন্ডাক্টর অঙ্কে গৌড়া।
বইয়ের প্রতি এই অনন্য এবং অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ৭৫ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ চলতি বছর ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’ পদকে ভূষিত হয়েছেন। অভাবের এক চিলতে ঘরে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা একটি মাত্র বাল্বের আলোয় এই বিশাল বইয়ের ভাণ্ডার আগলে সস্ত্রীক মেঝের এক কোণে অতি সাধারণ জীবনযাপন করছেন এই প্রচারবিমুখ গুণী মানুষটি।
অঙ্ক গৌড়ার জীবনসংগ্রাম ও বই সংগ্রহের ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৯৫১ সালে কর্নাটকের মাণ্ড্য জেলার চিনাকুর্লি গ্রামের এক অতি সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশবে চরম অভাবের কারণে বই পড়ার পর্যাপ্ত সুযোগ না পেলেও পরবর্তীতে কলেজ জীবনে এক অধ্যাপকের বিশেষ অনুপ্রেরণায় তার মধ্যে বই পড়া এবং বই সংগ্রহের এক দুর্লভ নেশা তৈরি হয়।
মাত্র ২০ বছর বয়সে সামান্য উপার্জনের বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও অবসরে নিজের অদম্য ইচ্ছায় পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং পরবর্তীতে কন্নড় সাহিত্যে স্নাতকোত্তর বা এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পর প্রায় দীর্ঘ তিন দশক তিনি একটি স্থানীয় চিনি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন।
বিগত পাঁচ দশক ধরে অঙ্কে গৌড়া তার জীবনের মোট উপার্জনের প্রায় ৮০ শতাংশ টাকাই শুধু বই কেনার পিছনে খরচ করেছেন। একপর্যায়ে বইয়ের বিশাল সংগ্রহ রাখার জায়গার সংকুলান না হওয়ায় তিনি নিজের একমাত্র থাকার বাড়িটি পর্যন্ত বিক্রি করে দেন এবং সেই অর্থ দিয়ে গড়ে তোলেন ‘পুস্তক মানে’ নামক লাইব্রেরি, যা বর্তমানে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম একটি সম্পূর্ণ ফ্রি লাইব্রেরি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
বর্তমানে এই অনন্য লাইব্রেরিতে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন ভাষার প্রায় লক্ষাধিক অমূল্য বই রয়েছে, যার মধ্যে বিশ্বমানের ক্লাসিক সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন, ইতিহাস এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রয়োজনীয় বই অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া সেখানে রয়েছে প্রায় ৫ হাজার বিভিন্ন ধরনের মূল্যবান অভিধান এবং বহু প্রাচীন বিরল পাণ্ডুলিপি ও পুরোনো ঐতিহাসিক সংবাদপত্র।
এই লাইব্রেরির সবচেয়ে বড় এবং মানবিক বৈশিষ্ট্য হলো এর দুয়ার দেশের সর্বস্তরের জ্ঞানপিপাসু মানুষের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত। এখানে বসে পড়াশোনা করার জন্য কোনো ধরনের মেম্বারশিপ ফি বা প্রবেশমূল্য লাগে না। ফলে প্রতিদিন অগণিত সাধারণ ছাত্রছাত্রী, দেশি-বিদেশি গবেষক ও প্রখ্যাত লেখকদের পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের স্বনামধন্য বিচারপতিরাও বহুবার এখানে প্রয়োজনীয় বই ও তথ্যের খোঁজে এসেছেন।
অঙ্কে গৌড়া শুধু এই লাইব্রেরি তৈরিই করেননি, বরং স্ত্রী বিজয়লক্ষ্মীকে নিয়ে এই বিশাল বইয়ের ঘরের এক কোণে মেঝেতেই রাতে ঘুমান এবং সেখানেই কষ্ট করে খাওয়া-দাওয়া করেন। তাদের একমাত্র ছেলে সাগরও প্রতিদিন এই বিপুল পরিমাণ বইয়ের যত্ন নেন এবং সেগুলো ক্যাটালগ অনুযায়ী গুছিয়ে রাখতে দিনরাত সাহায্য করেন।
বর্তমানে এই ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটি অত্যন্ত বড় হয়ে যাওয়ায় এর সঠিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা এই দরিদ্র পরিবারের পক্ষে বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এখনও হাজার হাজার মূল্যবান বই তালিকাভুক্ত করা বাকি রয়েছে। অঙ্কে গৌড়ার পরিবার আশা করছে যে সরকারি বিশেষ অনুদান বা স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তরিক সাহায্য পেলে এই বিশাল ও ঐতিহাসিক বইয়ের ভাণ্ডারকে তারা দ্রুত ডিজিটালাইজড এবং দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে পারবেন।
ভারতের অত্যন্ত সম্মানজনক পদ্মশ্রী পুরস্কার পাওয়ার পরেও প্রচারবিমুখ আঙ্কে গৌড় অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন যে তিনি কোনো দিন পুরস্কার বা খ্যাতির মোহে এই কাজ করেননি; তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল সমাজ ও মানুষের কাছে বইকে সহজলভ্য করে দেওয়া।
সূত্র: নিউজ ১৮
সময়ের আলো/টিএইচ