মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ এবং দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হার বজায় থাকতে পারে এমন আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। এক কার্যদিবসেই এই মূল্যবান ধাতুর দাম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার (২৯ মে) দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠার পর সোমবার (১ জুন) স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ১.৯ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,৪৫১.৬৫ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
একই সঙ্গে আগামী জুন মাসের ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচার বা আগাম বাজার দরও ২.৫ শতাংশ কমে আউন্স প্রতি ৪,৪৭৯.২০ ডলারে নেমে এসেছে। বাণিজ্য ডেস্কে প্রকাশিত বৈশ্বিক কমোডিটি বাজার বিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই দরপতনের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থানও স্বর্ণের মূল্যের ওপর তীব্র চাপ তৈরি করেছে। বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হলে ডলার-মূল্যে নির্ধারিত যেকোনো মূল্যবান ধাতু অন্যান্য মুদ্রার আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, যার ফলে বাজারে স্বাভাবিকভাবেই সার্বিক চাহিদা কমে যায়।
আমেরিকান গোল্ড এক্সচেঞ্জের প্রধান বাজার বিশ্লেষক জিম উইকফ সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বলেন, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কর্তৃক দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদের হার বজায় রাখার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা মূলত স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করছে। তবে বন্ডের লভ্যাংশ বা ইল্ড বৃদ্ধি থেমে গেলে কিংবা সুদের হার কমতে শুরু করলে স্বর্ণের বাজারে পুনরায় স্বস্তি আসতে পারে।
এরই মধ্যে সপ্তাহান্তে ইরানের নির্দিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন বিমান হামলার পর তেহরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে। একই সঙ্গে ইরানের আলোচক দল আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সকল পরোক্ষ যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় তাসনিম সংবাদ সংস্থা।
মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম অস্থির পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার আরও বাড়াতে পারে এমন প্রত্যাশাও চরমভাবে জোরদার হয়েছে।
শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জ বা সিএমই গ্রুপের ফেডওয়াচ টুলের সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী, আর্থিক বাজারের সিংহভাগ বিনিয়োগকারী এখন ধারণা করছেন, চলতি বছর শেষে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত আরও একবার সুদের হার বাড়ার প্রায় ৫৬ শতাংশ জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণত অর্থনৈতিক অস্থিরতা বা মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে স্বর্ণকে সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও উচ্চ সুদের হারের পরিবেশে এটি তীব্র চাপের মুখে পড়ে, কারণ স্বর্ণে বিনিয়োগ করলে সরাসরি কোনো সুদ বা নিয়মিত মুনাফা পাওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দিনগুলোতে মার্কিন কর্মসংস্থান সংক্রান্ত দাপ্তরিক তথ্য এবং ফেডারেল রিজার্ভের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্য বিশ্ববাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্যাক্সো ব্যাংকের সিনিয়র বিশ্লেষক ওলে হ্যানসেন বৈশ্বিক পূর্বাভাসে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এবং জ্বালানি সংকট কমতে শুরু করলে বিনিয়োগকারীরা আবারও সেই মৌলিক বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের বাজারকে চাঙা রাখতে সমর্থন করে।
এছাড়া আগামী বছর জুড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণের বড় নিট ক্রেতা হিসেবে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে স্বর্ণের পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও আজ পতন দেখা গেছে। স্পট রুপার দাম ১.৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৭৩.৯৬ ডলারে নেমেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্লাটিনামের দাম ০.৪ শতাংশ কমে ১,৯০৮.৯১ ডলারে এবং প্যালাডিয়ামের দাম ০.৮ শতাংশ কমে ১,৩৪৩.০৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
সময়ের আলো/টিএইচ