আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে গিয়ে মন্ত্রিত্ব গেল ১০২ দিনে

সাব্বির আহমেদ

জাতীয়

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগকে ঘিরে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০২ দিনের

2026-06-02T00:35:32+00:00
2026-06-02T11:42:41+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে গিয়ে মন্ত্রিত্ব গেল ১০২ দিনে
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ১২:৩৫ এএম  আপডেট: ০২.০৬.২০২৬ ১১:৪২ এএম
দীপেন দেওয়ান। ছবি : সংগৃহীত
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগকে ঘিরে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০২ দিনের মাথায় তার এই আকস্মিক পদত্যাগের পেছনে দীপেন দেওয়ান স্বাস্থ্যগত জটিলতার কথা বললেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ভিন্ন ঘটনা। এর পেছনে আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক রেষারেষির বিষয় উঠে এসেছে। এই পদত্যাগের ঘটনায় পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পুনর্গঠনে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে দীপেন দেওয়ানের দ্বন্দ্বও বড় করে সামনে আসছে।

ঈদের ছুটি শেষে কর্মদিবসের প্রথম দিন সোমবার সকালেই খবর আসে পদত্যাগ করলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। একই দিনে তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরুর সাড়ে তিন মাসের মাথায় তিনি পদত্যাগ করলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান মন্ত্রিসভা থেকে তার পদত্যাগের কারণ হিসেবে স্বাস্থ্যগত জটিলতার কথা বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বরাবরে লেখা সেই পদত্যাগপত্রে দীপেন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আমি শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগছি। আমার শারীরিক অসুস্থতার কারণে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নানাধিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধির স্বার্থে আমার বর্তমান পদ থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করা আবশ্যক বলে মনে করছি। মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে জানতে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির কয়েকজন বিএনপি নেতা, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে। 

সময়ের আলোকে তারা বলেন, পাহাড়ে দীপেন দেওয়ানের অনুসারীদের প্রভাব বিস্তার চলছিল। এলাকায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। সবশেষ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়ে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই দীপেন দেওয়ান ও মীর হেলালের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। প্রতিমন্ত্রী চেয়েছিলেন রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারকে পরিষদের চেয়ারম্যান করতে। আর মন্ত্রীর চাওয়া নিজের একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে নিযুক্ত করা।

নির্বাচনের তিন মাস পার হলেও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়নি। খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা পরিষদ গঠনে তেমন কোনো জটিলতা না থাকলেও রাঙামাটি জেলা পরিষদ পুনর্গঠন নিয়ে দীপেন দেওয়ানকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ হলো বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙামাটি পার্বত্য জেলার একটি বিশেষ স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকারি সংস্থা, যা পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। জেলার উপজাতীয় ও অ-উপজাতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এটি একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। অন্তর্বর্তী সময় থেকে পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কৃষিবিদ কাজল তালুকদার।

দীপেন দেওয়ানের আরেকজন ঘনিষ্ঠ নেতা সময়ের আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই দীপেন দেওয়ানকে পদত্যাগ করতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। মনে হচ্ছে এটি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ নয়, বাধ্যতামূলক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে গত এক মাস ধরে পার্বত্যের আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ আসছিল। মন্ত্রী এককভাবে তার বলয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন। অন্য দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সমন্বয় করছিলেন না। এতে প্রধানমন্ত্রী নাখোশ হন। রাঙামাটির রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন ছাত্রদলের এমন একজন শীর্ষ নেতা সময়ের আলোকে বলেন, দীপেন দেওয়ান দলের মধ্যে গ্রুপিংয়ে সবার চেয়ে সেরা। সবখানে নিজস্ব গোত্র তৈরি করেছেন। এটি তার জন্য কাল হয়েছে।

বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা সময়ের আলোকে জানান, প্রধানমন্ত্রী ঈদের আগে গুলশান কার্যালয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে জিজ্ঞেস করেন, কি ব্যাপার, সব পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ হয়ে যাচ্ছে? পার্বত্য রাঙ্গামাটিতে দিচ্ছ না কেন? এসময় উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালও। প্রতিমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, মন্ত্রী এটা নিয়ে বসতে চাচ্ছেন না। তিনি সমন্বয় করছেন না। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা আনতে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। দেশের স্বার্থে কোনো কার্পণ্য করবেন না তিনি। এমনও আভাস পাওয়া যাচ্ছে আসন্ন বাজেটের আগে-পরে আরও কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বাদ যেতে পারেন। নতুন করে কেউ কেউ যুক্তও হতে পারেন। কারোর দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হতে পারে।

দীপেন দেওয়ানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এম. আর. হোসাইন জহির সময়ের আলোকে বলেন, সোমবার স্যার কোথাও যাননি। ঢাকার বাসাতেই ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মন খারাপ। এই মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলতে পারছি না। 

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে দীপেন দেওয়ান বলেন, আমার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা আছে। আমি তো দল করি। দলের স্বার্থকে বড় করে দেখি। আমি তো এমপি আছি। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার আস্থা আছে। তিনি বিষয়টি বুঝতে পারবেন। আমার খারাপ লাগছে। হয়তো প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝানো হয়েছে। তবে আমি যেখানে (পার্বত্য অঞ্চল) রাজনীতি করি সেখানকার স্বার্থ দেখতে হবে।

রাজনীতি করার জন্য দীর্ঘ ২০ বছরের জুডিশিয়াল সার্ভিসের (জজের) চাকরি ছেড়ে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় মন্ত্রিত্ব ছাড়লেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে রাঙামাটি আসন থেকে রেকর্ড সর্বোচ্চ ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

দীপেন দেওয়ান ২০০৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে জেলা যুগ্ম জজ থেকে অবসর নেন। যোগ দেন বিএনপিতে। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের নির্ধারিত সময়সীমা পূর্ণ না হওয়ায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও নির্বাচনে অংশ নেন তার সহধর্মিণী মৈত্রী চাকমা। পরে তিনি জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদকের পদে রয়েছেন।

রাঙামাটি জেলা বিএনপির একজন নেতা টেলিফোনে সময়ের আলোকে বলেন, একটা সুযোগ হাতছাড়া হলো। অনেক কষ্টে এই অঞ্চল থেকে একজন মন্ত্রী পেয়েছিল পাহাড়ি সম্প্রদায়। এর আগে কখনো এই এলাকা থেকে কেউ পূর্ণ মন্ত্রী ছিলেন না। পাহাড়িদের জন্য অনেক কাজ করার সুযোগ ছিল। রাঙামাটি থেকে মন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় বিএনপির নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস ছিল। 

তিনি বলেন, পার্বত্যমন্ত্রী হিসেবে দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব পেলেও সমতল এলাকার নেতা মীর হেলালকে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়াকে কেন্দ্র করে পাহাড়ের আঞ্চলিক দল ও সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। পার্বত্য অঞ্চলের সুশীল সমাজের অনেকেই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া।

এ বিষয়ে রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদার দীপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পার্বত্যমন্ত্রী কেন পদত্যাগ করেছেন সেটি তিনি পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন। তার পদত্যাগের বিষয়ে আমরা বিস্তারিত কিছু জানি না। তবে আমাদের দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। আমরা সবসময় আমাদের সাবেক সভাপতি দীপেন দেওয়ান এমপি ও মন্ত্রীকে সম্মান করেছি।

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে রাঙামাটিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। সোমবার বিকাল ৫টা থেকে বিএনপির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক অবরোধ করে রাখে। শহরের কাঁঠালতলিস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক অবরোধ করার কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকে কিছুক্ষণ।

‘জোরপূর্বক পদত্যাগ, মানি না, মানব না। দীপন দেওয়ানের পদত্যাগ রাঙামাটিবাসী, পাহাড়ি সম্প্রদায় মানে না। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাই, মানি না, মানব না।’ এমন স্লোগান দিতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা।

বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য রাখা বিএনপি নেতারা বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন ছিল। মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় তার এই পদত্যাগ স্থানীয় জনগণ ও দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না। অবিলম্বে এই পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে তাকে স্বপদে বহাল রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি জোরালো দাবি জানান তারা।

রাঙামাটি জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর সুমন বলেন, দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ আমরা মেনে নিতে পারছি না। এখানে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ থাকবে বিষয়টি ক্ষতিয়ে দেখার এবং দীপেন দেওয়ানকে পুনরায় মন্ত্রী পদে বহাল করার।

আরবিএন 


  বিষয়:   পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়  মন্ত্রী  দীপেন দেওয়ান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: