দেশের ব্যাংকিং খাতে পুনঃতফসিল (রি-শিডিউল) সুবিধা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এই নীতিগত নমনীয়তা সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে এবং ব্যাংকিং খাত আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পৌঁছেছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৬ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ ও প্রভিশনসংক্রান্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুনঃতফসিল এখন আর সমস্যার সমাধান নয় বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ ‘লুকানোর কৌশলে’ পরিণত হয়েছে, যার ফলে প্রকৃত চিত্র সময়ের সঙ্গে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই স্বল্প সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। এই প্রবণতা নির্দেশ করে ঋণ আদায়ের চেয়ে নতুন করে ঋণ শ্রেণিকরণ সমস্যাই দ্রুত বাড়ছে।
একই সময়ে দেশের মোট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে শ্রেণিকৃত বা সমস্যাগ্রস্ত ঋণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি তিন টাকার মধ্যে প্রায় এক টাকাই এখন ঝুঁঁকিপূর্ণ বা খেলাপি অবস্থায় রয়েছে।
এক বছরে পরিস্থিতির নাটকীয় অবনতি : পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ছিল ২৪.১৩ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ৩২.২৬ শতাংশে পৌঁছায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বৃদ্ধি হয়েছে ৮.১৩ শতাংশ পয়েন্ট, যা ব্যাংকিং খাতে একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের দ্রুত বৃদ্ধি কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক প্রবণতা নয় বরং এটি নীতিগত দুর্বলতা ও দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল।
সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট সরকারি ব্যাংকে : ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৪৫.৮৫ শতাংশে। এর মানে হলো, প্রায় অর্ধেক ঋণই এখন আদায় অনিশ্চিত।
অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকে এই হার ৩০.১১ শতাংশ, বিশেষায়িত ব্যাংকে ৪০.৭২ শতাংশ এবং বিদেশি ব্যাংকে মাত্র ৪.৮২ শতাংশ। এই ব্যবধান থেকে স্পষ্ট হয় যে ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাবের পার্থক্য ব্যাংকগুলোর পারফরম্যান্সে বড় ভূমিকা রাখছে।
‘পুনঃতফসিল এখন বাস্তবতা আড়াল করার হাতিয়ার’ : অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি মনে করেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে পুনঃতফসিল নীতির অপব্যবহার একটি বড় কারণ।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে সংজ্ঞা পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র দেখা যায় না। কিন্তু বাস্তবে এসব ঋণ ফেরত আসে না বরং সময়ের সঙ্গে এই ঋণ আরও বড় আকারে ফিরে আসে।
তার মতে, পুনঃতফসিলের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই একটি ‘চক্রাকার সমস্যা’ তৈরি করেছে, যেখানে একই ঋণ বারবার নতুনভাবে শ্রেণিকরণ করে সময়ক্ষেপণ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শ্রেণিকৃত ঋণের মধ্যে ৯৩.৬৯ শতাংশই ‘ব্যাড’ বা ‘লস লোন’, অর্থাৎ সবচেয়ে খারাপ শ্রেণির ঋণ। এই ধরনের ঋণ সাধারণত আদায়যোগ্য নয় বা অত্যন্ত কঠিনভাবে আদায় হয়। এটি নির্দেশ করে যে, সমস্যাটি শুধু শ্রেণিকরণ নয় বরং ঋণ আদায়ের সক্ষমতার গভীর সংকট।
একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতিও বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা কিন্তু সংরক্ষিত আছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার বেশি।
বড় ঋণগ্রহীতাদের আধিপত্য : অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোট অনাদায়ী ঋণের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশই মাত্র ১৫ থেকে ২০টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কাছে আটকে আছে।
ফলে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ছড়িয়ে না পড়ে বরং নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর ওপর কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন অজুহাতে ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংকগুলো এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে। এটি শুধু ব্যাংকের সমস্যা নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি।
রাজনৈতিক প্রভাব ও তদারকির সীমাবদ্ধতা : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ রাজনৈতিক প্রভাব এবং তদারকির দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা সহজেই ঋণ পুনঃতফসিল করিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন, ফলে প্রকৃত চাপ ব্যাংকগুলোর ওপর থেকে কমে যায় না।
অর্থনীতিবিদ ড. মুজেরির মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত না করলে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে না পারলে খেলাপি সংস্কৃতি আরও গভীর হবে। এখানে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুর্বলতা, প্রভাবশালী মহলের চাপ এবং ব্যাংকিং তদারকির সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে কাজ করছে।
অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক ঝুঁকি : খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, পুরো অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রথমত ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট বাড়ছে, ফলে ভবিষ্যতে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং দুর্বল হচ্ছে, এ কারণে বিদেশি ঋণ পাওয়া আরও কঠিন ও ব্যয়বহুল হচ্ছে। তৃতীয়ত বৈদেশিক বাণিজ্যে এলসি গ্রহণে অনীহা তৈরি হতে পারে, যা রফতানি ও আমদানি উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। চতুর্থত নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ কমে যেতে পারে, কারণ ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা কমে গেলে উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন।
আমানতকারীদের জন্য বড় ঝুঁকি : সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো সাধারণ আমানতকারীদের জন্য। ব্যাংকিংব্যবস্থায় আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে ব্যাংকগুলো একসময় আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হতে পারে। তখন পুরো আর্থিকব্যবস্থায় আস্থার সংকট তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ ও প্রভিশনসংক্রান্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক গভীর কাঠামোগত সংকটে রয়েছে। পুনঃতফসিল সুবিধা দিয়েও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে না আসা প্রমাণ করছে, সমস্যাটি শুধু আর্থিক নয় বরং নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
সংকট উত্তরণের পথ : অর্থনীতিবিদদের মতে, এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কয়েকটি কঠোর ও কাঠামোগত পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং বড় খেলাপিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আদায় নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত ঋণ পুনঃতফসিল নীতি আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করতে হবে যাতে এটি অপব্যবহারের হাতিয়ার না হয়। তৃতীয়ত ঋণগ্রহীতাদের রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয় নির্বিশেষে সমানভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও তদারকি ক্ষমতা আরও বাড়ানো এবং প্রয়োগ করা জরুরি।
তারা মনে করেন, এখনই যদি কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে এই সংকট ভবিষ্যতে দেশের পুরো আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য জানতে মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
/এসএকে