যুক্তরাষ্ট্র শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার উদ্দেশ্যে দান করা ৮৯টি ফ্রেশ ক্যাডাভার বা তাজা মরদেহ ইসরাইলে সরবরাহ করেছে এমন অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এসব মরদেহ যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এবং ইসরাইলি সামরিক চিকিৎসা দলের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সামনে এনেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার অনুসন্ধানধর্মী সিরিজ ‘ডাইরেক্ট ফ্রম’।
আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেভাদায় কর্মরত মেডিকেল কেস ম্যানেজার মিরিয়াম ভলপিন ২০২৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউএসসি) এক শিক্ষানবিশ সাংবাদিকের কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়ে গভীর উদ্বেগে পড়েন। জেনিফার নেহরার নামের ওই শিক্ষার্থী একটি অনুসন্ধানী দলের সদস্য ছিলেন।
দলটি একটি গুরুতর অভিযোগের তদন্ত করছিল। অভিযোগটি হলো, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করা মরদেহগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এমনকি এর মধ্যে কয়েকটি মরদেহ ইসরাইলি সামরিক সার্জনদের হাতেও পৌঁছে থাকতে পারে।
মিরিয়ামের মা জিনেট ভলপিন, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্লাইট নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, মৃত্যুর আগে নিজের দেহ শিক্ষা ও গবেষণার জন্য ইউএসসিকে দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ২০২১ সালে ১০১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানের পর মিরিয়াম ভলপিন আশঙ্কা করছেন, তার মায়ের দেহ হয়তো যুদ্ধক্ষেত্র-সংক্রান্ত অস্ত্রোপচার প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ইসরাইলের গাজা অভিযানের মতো সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ইউএসসি এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর (ইউসিএসডি) ছাত্র সাংবাদিকদের যৌথ অনুসন্ধানে জানা যায়, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর মাধ্যমে ইসরাইলি সার্জিক্যাল টিমের প্রশিক্ষণের জন্য মানবদেহ সরবরাহ করেছে। নথিপত্র অনুযায়ী ২০১৮ সাল থেকে ইউএসসি অন্তত ৮৯টি ‘ফ্রেশ ক্যাডাভার’ বা সংরক্ষিত মৃতদেহ সরবরাহ করেছে, যা মার্কিন নৌবাহিনী ও ইসরাইলি সামরিক চিকিৎসা দলের প্রশিক্ষণ চুক্তির অংশ ছিল।
২০২০ সালে ইউএসসি ও মার্কিন নৌবাহিনীর প্রশিক্ষকদের প্রকাশিত একটি মেডিকেল গবেষণাপত্রে চার দিনের একটি ‘কমব্যাট ট্রমা সার্জারি স্কিলস কোর্স’-এর বিবরণ পাওয়া যায়। এই কোর্সটি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ‘ফরওয়ার্ড সার্জিক্যাল টিম’-এর জন্য পরিচালিত হয়েছিল, যারা যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি অবস্থানে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে।
প্রশিক্ষণের সময় মৃতদেহগুলোকে ‘পারফিউশন’ নামক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে রক্তসঞ্চালন করিয়ে জীবন্ত মানুষের মতো করে তোলা হতো। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের শরীরে রক্তক্ষরণের পরিস্থিতি বাস্তবসম্মতভাবে অনুকরণ করা সম্ভব হয়। গবেষণাপত্রে বর্ণিত প্রশিক্ষণে বুকে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া, মুখমণ্ডল ও দেহে বিস্ফোরণের আঘাতসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধজনিত জখমের চিকিৎসা অনুশীলন করা হয়।
ইউএসসি এ বিষয়ে আলজাজিরার একাধিক প্রশ্নের জবাবে নির্দিষ্ট তথ্য জানায়নি। যেমন ওইসব মৃতদেহে কী ধরনের আঘাত করা হয়েছিল বা কীভাবে সেসব প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি দাবি করেছে, এটি কোনো ‘সামরিক কর্মসূচি’ নয়; বরং একটি ‘শিক্ষামূলক’ কার্যক্রম, যেখানে অংশগ্রহণকারী ইসরাইলি চিকিৎসাকর্মীরা সাধারণ নাগরিক।
অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনী জানিয়েছে, অভিজ্ঞ ট্রমা সার্জনরা অস্ত্রোপচারের কৌশল ব্যবহার করে জটিল আঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে প্রশিক্ষণার্থীরা বাস্তবসম্মত পরিবেশে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় মৃতদেহ সরবরাহে ইউএসসি একসময় পর্যাপ্ত সক্ষম ছিল না। ফলে তারা ইউসিএসডির সহায়তা নেয়।
ছাত্র ও সাংবাদিকদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত ইউসিএসডি থেকে ১২৪টি মৃতদেহ ইউএসসিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে ইউসিএসডি দাবি করেছে, তাদের দান করা মৃতদেহ ‘সামরিক প্রশিক্ষণে’ ব্যবহৃত হয় বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা প্রকৃত পরিস্থিতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় দুটির নীতিমালা অনুযায়ী দেহদাতারা মৃত্যুর পর তাদের দেহ কীভাবে ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে কোনো শর্ত আরোপ করতে পারেন না। একইভাবে পরিবারের সদস্যদেরও সেই তথ্য জানার সুযোগ থাকে না। এ অবস্থায় অনেক পরিবার প্রশ্ন তুলছে যদি তারা আগে জানতেন যে দানকৃত মৃতদেহ সামরিক সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতে পারে, তা হলে কি তারা সেই সিদ্ধান্তে সম্মতি দিতেন?
আলজাজিরার অনুসন্ধান নতুন করে দেহদানের নৈতিকতা, স্বচ্ছতা এবং দাতাদের সম্মতির সীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির তথ্য ফাঁস হওয়ার পর শরীর দান করতে ইচ্ছুক এমন অনেকেই এখন তাদের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলছেন।
ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ওয়েন্ডি স্মিথ আলজাজিরাকে বলেন, শিক্ষানবিশ সাংবাদিকদের প্রতিবেদন দেখার পর তিনি নিজের শরীর দান করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। গত এপ্রিলে আলজাজিরার প্রামাণ্যচিত্র দলের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্মিথ বলেন, আমি গণহত্যা ও অনাহারকে সমর্থন করতে চাই না। এমনকি ক্ষুদ্রতম কোনো উপায়েও আমি ইসরাইলের নীতিকে সমর্থন করতে প্রস্তুত নই।
সময়ের আলো/আআ