রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদফতর গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অর্ডিন্যান্সের বিভিন্ন বাধ্যতামূলক বিধান লঙ্গন করায় কেন হাসপাতালের লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হবে না, তা জানতে চেয়ে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটি আনুষ্ঠানিক কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শোকজ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
আইন অনুযায়ী এই নোটিশের লিখিত উত্তর দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আগামী ৭২ ঘণ্টা অর্থাৎ আগামী রোববার বিকেল ৫টা পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং নোটিশটি ইতিমধ্যে হাসপাতালের মূল গেটে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অপরাধ, চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য ব্যুরো ডেস্কে আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর খবরের বিস্তারিত জানা গেছে।
এর আগে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলেই আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী তদন্ত রিপোর্টের বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের স্পষ্ট জানান, নবজাতকদের মৃত্যুর মূল কারণ ছিল একটি অত্যন্ত ছোট ও সংকীর্ণ কক্ষে দীর্ঘ সময় ধরে এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ থাকা। এই প্রয়োজনীয় এসি সচল না থাকায় ওই বিশেষ কক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র অক্সিজেন স্বল্পতা দেখা দেয় এবং এর ফলে বাতাসে ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। মূলত প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি থাকার পরও তা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর পেছনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ অবহেলা ও উদাসীনতা তদন্তে সম্পূর্ণ স্পষ্ট প্রমাণিত হয়েছে এবং এই প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের বিদ্যমান আইন মোতাবেক দায়ীদের কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার ৩ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেয় এবং আজ বৃহস্পতিবার সকালে স্বাস্থ্য অধিদফতর গঠিত পৃথক কমিটি তাদের রিপোর্ট পেশ করে। এর আগে গত ২৭ মে ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে এই ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়, যার পরদিন ২৮ মে থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
তিন সদস্য বিশিষ্ট সরকারি তদন্ত কমিটির দাপ্তরিক প্রতিবেদনে হাসপাতালটির সার্বিক অব্যবস্থাপনার বিষয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে ভবনটিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল সেটি মূলত একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল পরিচালনার জন্য কোনোভাবেই উপযুক্ত নয়।
সেখানে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি রাখা হয়েছিল এবং এসি বন্ধ থাকায় কক্ষের ভেতর ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস বেড়ে যাওয়ার পর অসহায় অভিভাবকরা বারবার আকুতি জানালেও কর্তব্যরত নার্সরা কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি। হাসপাতাল পরিচালনার জন্য কর্তৃপক্ষ ন্যূনতম উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি এবং ভবিষ্যতে যেকোনো বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স দেওয়ার আগে ভবনটি শতভাগ পরিদর্শনের জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিটির চূড়ান্ত মূল্যায়নে এসি বন্ধ থাকা, অক্সিজেন স্বল্পতা, সংকীর্ণ কক্ষ, জরুরি মুহূর্তে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত না থাকা এবং নার্সদের চরম অসহযোগিতার কারণে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রাণঘাতী অবহেলা পুরোপুরি প্রমাণিত হয়েছে।
সময়ের আলো/টিএইচ