আইন আছে, জলাশয় নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

আইন আছে কাগজে-কলমে। আদালতের রায়ও আছে। আছে সংরক্ষণের বিধান। তবু ঢাকার মানচিত্রে জলাশয়ের অস্তিত্ব ক্রমেই বিলীন হচ্ছে। সেখানে ক্রমেই জমে

2026-06-05T01:04:40+00:00
2026-06-05T01:04:40+00:00
 
  শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬,
২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
জাতীয়
আইন আছে, জলাশয় নেই
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ১:০৪ এএম   (ভিজিট : ১১)
ঢাকার মানচিত্রে জলাশয়ের অস্তিত্ব ক্রমেই বিলীন হচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত
আইন আছে কাগজে-কলমে। আদালতের রায়ও আছে। আছে সংরক্ষণের বিধান। তবু ঢাকার মানচিত্রে জলাশয়ের অস্তিত্ব ক্রমেই বিলীন হচ্ছে। সেখানে ক্রমেই জমে উঠেছে ইট, কংক্রিট আর বাণিজ্যিক স্থাপনা। যে শহরে একসময় নদী, খাল আর পুকুর ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ, সেখানে এখন পানি মানেই সমস্যা : জলাবদ্ধতা, দূষণ, আর দুর্ভোগ।

বুড়িগঙ্গা, তুরাগ আর বালু নামের নদ-নদীগুলো এখন আর শহরের প্রাণরেখা নয়, বরং চাপা পড়ে থাকা বর্জ্যরে নালা। খালগুলো হারিয়ে গেছে বক্স কালভার্টের নিচে, আর পুকুরগুলো মানচিত্র থেকে মুছে গেছে নীরবে, কোনো ঘোষণা ছাড়াই। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই; এভাবেই বদলে গেছে পুরো ঢাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু পরিবেশগত ব্যর্থতা নয়, বরং নগর শাসনের ধারাবাহিক দুর্বলতা ও দায়হীন উন্নয়ননীতির অনিবার্য পরিণতি। তাদের ভাষায়, আইন ও বাস্তবতার এই ফাঁক যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই শহর নিজের সহনশীলতা হারাচ্ছে। সবমিলে জলাধার এখন আর কেবল পরিবেশের প্রশ্ন নয়- এটি সরাসরি নগর টিকে থাকার প্রশ্ন।

ঢাকার নদীগুলো মৃত্যুপথযাত্রী : ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বুড়িগঙ্গা। একসময় এই নদী ছিল রাজধানীর অর্থনীতি, নৌ-যোগাযোগ ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। এখন সেই নদীর বুকে শিল্পবর্জ্য, পলিথিন, রাসায়নিক ও পয়োবর্জ্যরে ভারে পানি প্রায় স্থবির। শুষ্ক মৌসুমে অনেক জায়গায় নদীর পানি কালো হয়ে দুর্গন্ধ ছড়ায়, যা নদীকে কার্যত মৃতপ্রায় অবস্থায় নিয়ে গেছে।

তুরাগ নদীর অবস্থাও উদ্বেগজনক। রাজধানীর পশ্চিমাংশে এই নদীর দুই তীরজুড়ে বছরের পর বছর ধরে চলছে অবৈধ দখল। ইটভাটা, কারখানা ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্য ও আবর্জনা ফেলার কারণে পানিদূষণও বেড়েছে।

পূর্ব ঢাকার বালু নদীও একই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে দখল ও ভরাটের কারণে নদীর প্রস্থ সঙ্কুচিত হয়েছে। নদীর তীরে গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত বসতি ও শিল্পকারখানার বর্জ্য সরাসরি পানিতে পড়ায় জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে।

জলাবদ্ধতার নগর বাস্তবতা : নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী দখল শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি ঢাকার জলাবদ্ধতা, বন্যা ঝুঁকি এবং নগর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ও ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ায় বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ডুবে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ও খাল হারিয়ে যাওয়ার কারণে শহরের পানি ধারণক্ষমতা ভেঙে পড়েছে। পরিবেশবিদদের ভাষায়, ঢাকার নদীগুলোকে বাঁচানো না গেলে ঢাকা শহরকেও বাঁচানো যাবে না।

হারিয়ে যাওয়া পুকুরের শহর : একসময় ঢাকার প্রতিটি মহল্লায় ছিল পুকুর। গোসল, কাপড় ধোয়া, মাছ ধরা, আড্ডা- সবই চলত এসব জলাধারকে ঘিরে। এখন সেই চিত্র প্রায় বিলুপ্ত। পরিসংখ্যান বলছে, কয়েক বছর আগেও ঢাকায় প্রায় ১০০টি পুকুর ছিল। বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ২৯টি। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে হারিয়ে গেছে ৭১টি পুকুর। গেন্ডারিয়ার শতবর্ষী ডিআইটি পুকুর রক্ষায়ও নাগরিকদের আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে এই জলাধার ধ্বংস বড় ভূমিকা রাখছে। পানি ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়ায় শহর ক্রমেই ‘হিট আইল্যান্ড’-এ পরিণত হচ্ছে।

অবশিষ্ট জলাধারের টিকে থাকা চিত্র : নির্বিচারে দখল ও ভরাটের পরও কিছু পুকুর এখনও টিকে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পুকুর, জগন্নাথ হলের পুকুর এবং জহুরুল হক হলের পুকুর এখনও ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আছে। রমনা পার্কের পুকুর শহরের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তির জায়গা তৈরি করে রেখেছে। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরে নিয়মিত পুণ্যার্থীরা স্নান করতে আসেন। 

কদমতলা-রাজারবাগ কালীমন্দিরে রয়েছে গঙ্গাসাগর দীঘি। সবুজবাগের বৌদ্ধবিহারের পুকুরও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত। ইসলামপুরের নবাববাড়ীর পুকুরে প্রবেশ করতে নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়, তবে সেখানে সাবান ব্যবহার নিষিদ্ধ। বংশাল পুকুর ছয় বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত, যেখানে সিঁড়ি ও ঘাট রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে ১৮৪০ সালে স্থানীয় জমিদার হাজি বদরুদ্দীন ভুট্টো এটি খনন করেন। আরেকটি উল্লেখযোগ্য জলাধার হলো নওয়াব আবদুল বারী পুকুর, যা ১৮৩৮ সালে খনন করা হয়। এটি আহসান মঞ্জিল পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক একটি জলাধার।

খাল হারানো ও বক্স কালভার্টের নগর : নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ঢাকার জলাশয়গুলো ধারাবাহিকভাবে ভরাট করা হয়েছে। একইভাবে খালগুলো দখল করে তার ওপর বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। 

আশির দশকের মাঝামাঝি পরীবাগ খাল ভরাট করে বক্স কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে শহরের অধিকাংশ খালই এই কাঠামোর নিচে চাপা পড়ে। গোড়ানের খিলগাঁও-তিলপাপাড়া এলাকার একটি খাল ভরাট করে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ধোলাইখাল ও দয়াগঞ্জ খাল এখন কার্যত সড়কে পরিণত হয়েছে। কাজলাপাড় মোড় থেকে তিলপাপাড়া পর্যন্ত অংশটি ময়লা-আবর্জনায় প্রায় নর্দমায় রূপ নিয়েছে।

রাসেল স্কয়ার থেকে সোনারগাঁও হোটেল এলাকা, হাতিরপুল থেকে প্যান প্যাসিফিক, পান্থপথ থেকে পরীবাগ, মিরপুর বাউনিয়া খাল, সেগুনবাগিচা থেকে আরামবাগ- সব জায়গায় খালের অস্তিত্ব বক্স কালভার্টের নিচে চাপা পড়ে গেছে। পরীবাগ, ধোলাইখাল, রায়েরবাজার, আরামবাগ, গোপীবাগ, সেগুনবাগিচা, গোবিন্দপুর, কাঁঠালবাগান, নারিন্দা ও ধানমন্ডি- এই খালগুলোর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব আর নেই বলে গবেষণা ও স্থানীয় পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

গবেষণা ও পরিসংখ্যানের বাস্তবতা : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণা বলছে, ১৯৯৫ সালে ঢাকায় জলাভূমি ছিল ৩০.২৪ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ১৯৯৫-২০০০ সময়কালে ১১.৮২ বর্গকিলোমিটার ভরাট করা হয়, যা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সময়কাল। বর্তমানে শহরে অবশিষ্ট জলাভূমি মাত্র ৪.২৮ বর্গকিলোমিটার। যদিও সাম্প্রতিক আট বছরে ভরাটের গতি কিছুটা কমেছে, তবু দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি প্রায় স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আশির দশকে শুরু হওয়া খাল ভরাট ও বক্স কালভার্ট নির্মাণের ধারাবাহিকতা এখনো পুরোপুরি থামেনি, বরং এর ফল এখন শহরের জলাবদ্ধতায় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

আইন আছে, নেই জলাশয় : ঢাকার জলাশয়, নদী ও খাল রক্ষার জন্য বাংলাদেশে একাধিক আইন ও নীতিমালা রয়েছে, যা কাগজে-কলমে যথেষ্ট শক্তিশালী। ২০০০ সালে প্রণীত নদী রক্ষা কমিশন আইন অনুযায়ী নদী দখল ও দূষণ রোধে একটি পৃথক কমিশন গঠন করা হয়, যার দায়িত্ব হলো নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখল উচ্ছেদ এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করা। পাশাপাশি ২০১৩ সালে পানি আইন প্রণয়ন করা হয়, যেখানে পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এর আগে থেকেই কার্যকর রয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, যা অনুযায়ী কোনো জলাশয়, নদী বা খাল ভরাট, দখল বা দূষণ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। 

এই আইনে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। ঢাকার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০, যেখানে বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জলাধার, খাল বা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না এবং করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। 

আদালতের বিভিন্ন রায়েও নদী ও খালকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের দখলমুক্ত ও সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে হাইকোর্ট বারবার অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও নদী পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছে। তবু বাস্তবে এসব আইন, রায় ও বিধান প্রয়োগের ঘাটতি, সমন্বয়হীনতা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক চাপের কারণে ঢাকার জলাধারগুলো ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও বাস্তবতা : এ বিষয়ে নদী নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্য ধলেশ্বরী নদী হয়ে মিশছে বুড়িগঙ্গায়। এখনও কয়েক ডজন কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান রয়ে গেছে হাজারীবাগে। নদী রক্ষায় সীমানা পিলার নির্মাণ হলেও এর ভেতরেই গড়ে উঠেছে কারখানা ও দোকানপাট। বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে অভিযান চালিয়েও দমানো যাচ্ছে না দখলবাজদের। 

এখনও বেদখল হয়ে আছে শতাধিক একর জায়গা। নদীর জায়গায় কেউ কারখানা, কেউ বসতঘর, আবার মসজিদ বানিয়েও চালাচ্ছেন দখলদারিত্ব। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশনা বাস্তবায়নেরও অগ্রগতি নেই। নগর পরিকল্পনাবিদ ফজলে রেজা সুমন বলেন, শহরের মধ্যে খাল বা অন্যান্য জলাশয়গুলো হচ্ছে শহরের একটি সৌন্দর্য। এগুলো শহরের পরিবেশকে পরিবর্তন করে দেয়। 

কিন্তু ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে সেটি আমরা অনুভব করতে পারিনি এবং সরকারও এটার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। ১১টি খাল উদ্ধারের জন্য পদক্ষেপ নিতে দুই সিটি করপোরেশনকে আহ্বান জানানো হয়েছে আগেই। কিন্তু পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ঢাকা শহরের মধ্যে যেসব ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুর রয়েছে সেগুলো সংরক্ষণেও সরকারিভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে। 


  বিষয়:   আইন  জলাশয় 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: