মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র ইসরাইল। বিশেষ করে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ইরানের ওপর চালানো হামলার সময়ও মার্কিন সমর্থন ছিল প্রশ্নাতীত। এই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের মূলে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ নীতি, যা ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ (কিউএমই) বা ‘গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব’ নামে পরিচিত। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পর প্রশ্ন উঠেছে দশক পুরোনো এই নীতি কী তবে বদলে যেতে চলেছে? মিডল ইস্ট আইয়ের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে এক বিশদ বর্ণনা উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনযায়ী প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় ইসরাইলের জনসংখ্যা বেশ কম, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি। কিউএমই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো জনসংখ্যায় পিছিয়ে থাকলেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী যেন প্রযুক্তি ও শক্তিতে এই অঞ্চলের যেকোনো সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী বা জোটের চেয়ে সবসময় গুণগতভাবে এগিয়ে থাকে। এই নীতি বজায় রাখতে ওয়াশিংটন ইসরাইলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি এমন সব অত্যাধুনিক অস্ত্র ক্রয়ের সুযোগ দেয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
স্নায়ুযুদ্ধ থেকে কিউএমই আইনের যাত্রা : ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই নীতির বিকাশ ঘটে। ১৯৬৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন ইসরাইলের কাছে ৫০টি এফ-৪ ফ্যান্টম জেট বিক্রির চুক্তি করেন। পরবর্তীতে আশির দশকে রোনাল্ড রেগানের প্রশাসন প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ শব্দটি ব্যবহার করে। নব্বইয়ের দশকে সৌদি আরবের কাছে এফ-১৫এস যুদ্ধবিমান বিক্রি করলেও ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ন রাখতে সেগুলোর রাডার প্রযুক্তি কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
২০০৮ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলে ‘নেভাল ভেসেল ট্রান্সফার অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে কিউএমই নীতিটি মার্কিন আইনে পরিণত হয়। এই আইন অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশে মার্কিন অস্ত্র রফতানি যেন ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের জন্য হুমকি না হয় তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। ২০১৩ সালে বারাক ওবামার আমলে এই আইন আরও জোরদার করা হয়, যার ফলে প্রতি দুই বছর পরপর ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের মূল্যায়ন প্রতিবেদন কংগ্রেসে জমা দিতে হয়।
সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক সহায়তা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলকে ২৪০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সামরিক সাহায্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইসরাইলকে প্রতি বছর ন্যূনতম ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার গ্যারান্টি দেওয়া আছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং পরবর্তীতে গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার পর এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানো হয়। মার্কিন কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে এই বার্ষিক সহায়তার পরিমাণ রেকর্ড ১২.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
ইসরাইলের প্রধান অস্ত্র এফ-৩৫ : বর্তমানে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড় প্রতীক হলো আমেরিকার লকহীড মার্টিন কোম্পানির তৈরি এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার জেট। এটি রাডারকে ফাঁকি দিতে সক্ষম বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমান। ২০১০ সালে ইসরাইল প্রথম দেশ হিসেবে এই বিমান কেনার চুক্তি করে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কোনো দেশের বিমানবাহিনীতে এই যুদ্ধবিমান নেই। ইসরাইলের নিজস্ব প্রযুক্তিতে কাস্টমাইজড করা এই সংস্করণের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এফ-৩৫আই আদির’।
২০১৮ সালে লেবাননে হামলার মাধ্যমে ইসরাইলই বিশ্বে প্রথম এই যুদ্ধবিমানটি কোনো যুদ্ধে ব্যবহার করে। এরপর থেকে ইরান, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং গাজায় এটি ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের সময় আমেরিকা ইসরাইলকে তাদের এফ-৩৫ বিমানে অতিরিক্ত জ্বালানি ট্যাঙ্ক যুক্ত করার অনুমতি দেয়, যার ফলে মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহার না করেই বিমানগুলো ইসরাইল থেকে সরাসরি ইরানে গিয়ে হামলা চালিয়ে ফিরে আসতে সক্ষম হয়।
এ ছাড়া মার্কিন অর্থায়নে তৈরি আয়রন ডোম, অ্যারো এবং ডেভিডস স্লিংয়ের মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরাইলকে সুরক্ষিত রেখেছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে ইসরাইলের অঘোষিত অবস্থানকেও ওয়াশিংটন সবসময় আড়াল করে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও বাড়ছে বিরোধিতা : গাজায় ইসরাইলি গণহত্যার পর মার্কিন রাজনীতিতেও এই সহায়তার বিরুদ্ধে সুর চড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের একমাত্র ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট সদস্য রাশিদা তালাইব বলেন, আমেরিকার অর্থায়নে গাজায় যে গণহত্যা চলছে, তা থামাতে আমাদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
শুধু ডেমোক্র্যাট নয়, কট্টর ডানপন্থি রিপাবলিকানদের একাংশও এখন ইসরাইলে অর্থ ঢালার বিরোধী। গত বছর রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জোরি টেলর গ্রিন আয়রন ডোমের বাজেট ৫০০ মিলিয়ন ডলার কমানোর প্রস্তাব করেছিলেন, যা পরে নাকচ হয়ে যায়। জনপ্রিয় রক্ষণশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষক টাকার কার্লসনও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আগামীকালই ইসরাইলকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া বন্ধ করা।
ট্রাম্পের নীতি ও ভবিষ্যৎ ধোঁয়াশা : সম্প্রতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওয়াশিংটন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের কাছে শীর্ষ প্রযুক্তির এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের এই ঘোষণা ইসরাইলের কিউএমই নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা হবে। তা ছাড়া সৌদি আরবের কাছে এই অস্ত্র বিক্রির চুক্তিটি এখনও মার্কিন কংগ্রেসে পাশ হওয়া বাকি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়ালেও ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার মার্কিন মূল নীতিতে হয়তো বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। ইসরাইল ইতিমধ্যেই আরও ২৫টি এফ-৩৫ এবং এফ-১৫আইএ যুদ্ধবিমানের অর্ডার দিয়েছে, যা সরবরাহ করা হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইসরাইলের কাছেই থাকবে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম আধুনিক যুদ্ধবিমান বহর।