গত ১ জুন সোমবার প্রকাশ করা হয়েছে ‘গ্লোবাল রিফিউজি ক্রাইসিস ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন। এটি মূলত এক ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন প্রতিবেদনের সহ-সম্পাদক পেত্রা বেন্ডেল। প্রতিবেদনটি উপস্থাপনের সময় জার্মানির বাভারিয়ার এরলাঙ্গেন-নুরেমবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পেত্রা ‘কমন ইউরোপীয় অ্যাসাইলাম সিস্টেম’ (সিইএএস)-এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সিইএএস আইনি কাঠামোটি ২০২৪ সালে গৃহীত হয়েছিল। আগামী ১২ জুন থেকে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সব সদস্য রাষ্ট্রে আইনত বাধ্যতামূলক হিসেবে কার্যকর হবে। সিইএস কার্যকর হওয়ার আগে পেত্রা ব্রেন্ডেলের আশঙ্কা, ‘ইউরোপের বহি-সীমান্তগুলোতে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বন্দিশিবিরের আদলে তৈরি করা আবাসনের পরিসর আরও বাড়তে পারে।’
যে শরণার্থীদের আশ্রয় পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে মনে হবে, তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের তৃতীয় কোনো দেশের ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে রাখার পরিকল্পনার কঠোর সমালোচনা করেন পেত্রা বেন্ডেল। তবে ইইউর অভিবাসন-বিষয়ক কঠোরতর নীতির এ বৈশিষ্ট্যকে সম্প্রতি জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন (সিএসইউ) দলের নেতা আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট ‘উদ্ভাবনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
পেত্রা ব্রেন্ডেল মনে করেন, ইউরোপে সুরক্ষা চাইতে এসে এখন অনেকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, ভবিষ্যতে তাদের তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ‘বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের’ জন্য সংকট আরো ঘনীভূত হবে বলে আশঙ্কা তার। এ ধরনের প্রত্যাবাসন কেন্দ্র গড়ে তোলার বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে কয়েকটি সহযোগীসুলভ দেশের ওপর নির্ভর করতে হবে।
এমন সহযোগিতা আফ্রিকাতেই বেশি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে এসেছে তিউনিসিয়া ও মিসরের নাম। কারণ এই দেশগুলো আর ইউরোপের মাঝে রয়েছে শুধু ভূমধ্যসাগর। সুতরাং বেশি দূরে নয়, আবার ইউরোপেও নয়। তবে ভৌগোলিকভাবে ইউরোপের চেয়ে আরো দূরের দেশ রুয়ান্ডা ও উগান্ডার মতো দেশেও অবশ্য প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনের কথা ভাবা হচ্ছে।
পেত্রা ব্রেন্ডেল মনে করেন, ইউরোপে সুরক্ষা চাইতে এসে এখন অনেকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন, ভবিষ্যতে তাদের তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। ‘বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের’ জন্য সংকট আরো ঘনীভূত হবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
পেত্রা ব্রেন্ডেলের মতে, আফগানিস্তান থেকে আসা মানুষদের পুনর্বাসন কর্মসূচিগুলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জার্মান সরকার আফগানদের পুনর্বাসন কর্মসূচিগুলো স্থগিত করার পর থেকে আরও অনেক মানুষ মৌলবাদী তালেবানের নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন। এখনও অনেক আফগান অভিবাসনপ্রত্যাশী আটকা পড়ে আছেন পাকিস্তানে।
গ্লোবাল রিফিউজি ক্রাইসিস ২০২৬ শীর্ষক প্রতিবেদনের সহ-সম্পাদক পেত্রা ব্রেন্ডেল বলেন, যখন বলি, সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা উচিত জার্মানির, তখন ঠিক এই বিষয়টির কথাই বোঝাই আমি। সারা বিশ্বে বর্তমানে ১১ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। গত এক দশকে এমন মানুষের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। তাদের অধিকাংশই অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি (আইডিপি), অর্থাৎ তার নিজেদের অঞ্চলেই যুদ্ধ বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব (যেমন খরা ও বন্যা) থেকে বাঁচতে ঘর-বাড়ি ছেড়েছেন।
জার্মানির ওসনাব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন-বিষয়ক গবেষক ফ্রাঙ্ক ড্যুফেল ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিয়ে নতুন এই পরিকল্পনাকে ‘ত্রুটিপূর্ণভাবে প্রণীত’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এই সংস্কারের ফলে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি চলার সময় বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দেখা দিতে পারে এবং এর ফলে অভিবাসনপ্রত্যাশী শিশু, নারী এবং তাদের পরিবারের অধিকার সামগ্রিকভাবে খর্ব হতে পারে।
ফ্রাঙ্ক ড্যুফেল জানান, জার্মানিতে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সংখ্যা ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে কমছে। ২০২৩ সালে জার্মানিতে ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন, দুই বছর পর, সেই সংখ্যা কমে ১ লাখ ১৩ হাজারে নেমে আসে। এই প্রবণতা এখনও অব্যাহত। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) তাই প্রায় ২২ হাজার রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন নথিবদ্ধ করা হয়। এই হার অনুযায়ী পুরো বছরের হিসাব করলে বছর শেষে মোট আবেদনের সংখ্যা ৯০ হাজারেরও কম হতে পারে।
২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে বর্তমানে ১১ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত। গত এক দশকে এমন মানুষের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। তাদের অধিকাংশই অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি (আইডিপি), অর্থাৎ তার নিজেদের অঞ্চলেই যুদ্ধ বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে (যেমন খরা ও বন্যা) থেকে বাঁচতে ঘর-বাড়ি ছেড়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সারা বিশ্বে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়া এই মানুষদের খুব সামান্য অংশই শেষ পর্যন্ত ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছাতে পেরেছেন।