যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে গবাদিপশুদের ওপর আক্রমণ করছে মাংসখেকো পরজীবী ‘নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্ম’। এরই মধ্যে দুটি বাছুর এই পরজীবীতে আক্রান্ত হয়েছে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এই পরজীবী মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে। ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সেখানে দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করা হয়েছে। সংক্রমণ ধরা পড়ার পর সেখানকার গবাদিপশু আমদানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কানাডা।
বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী কানাডিয়ান ফুড ইনস্পেকশন এজেন্সি (সিএফআইএ) এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, সীমান্ত অতিক্রমের আগের ২১ দিনের মধ্যে টেক্সাসে অবস্থান করা গরু ও ঘোড়া আপাতত কানাডায় প্রবেশ করতে পারবে না। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) জানায়, টেক্সাসে দ্বিতীয় একটি বাছুরের শরীরে নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্ম পরজীবীর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বৃহৎ গরু ও গরুর মাংস উৎপাদনকারী অঙ্গরাজ্য টেক্সাসে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় শুক্রবার দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করেন গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মজুড়ে এটি আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্ম এক ধরনের পরজীবী মাছি। স্ত্রী মাছিগুলো জীবিত উষ্ণ রক্তের প্রাণী কিংবা মানুষের উন্মুক্ত ক্ষত ও শ্লেষ্মা ঝিল্লিতে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বের হওয়া শত শত লার্ভা ধারালো মুখ দিয়ে মাংসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। চিকিৎসা না করা হলে আক্রান্ত প্রাণী শেষ পর্যন্ত মারা যেতে পারে।
গত বুধবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ৬০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো টেক্সাসে এই পরজীবীর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তিন সপ্তাহ বয়সি একটি বাছুরের নাভির অংশে লার্ভা পাওয়া যায়। মেক্সিকো সীমান্ত থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরের লা প্রাইর শহরে ঘটনাটি শনাক্ত হয়। এরপর শুক্রবার জাভালা কাউন্টিতে এক মাস বয়সি আরেকটি বাছুরের শরীরে একই পরজীবী পাওয়া যায়। দ্বিতীয় ঘটনাস্থলটি প্রথম সংক্রমণস্থল থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে।
ইউএসডিএ জানিয়েছে, প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর যে ২০ কিলোমিটারব্যাপী নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল গঠন করা হয়েছিল, দ্বিতীয়টি সেই এলাকার মধ্যেই পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ওই এলাকায় কোয়ারেন্টিন, পশু চলাচলে নিয়ন্ত্রণ এবং নিবিড় নজরদারি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
এই সংক্রমণ মধ্য আমেরিকা ও মেক্সিকো হয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ায় একে একটি বৃহত্তর প্রাদুর্ভাবের অংশ বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নজরদারি চালিয়ে আসছে মার্কিন কৃষি ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। গভর্নর অ্যাবটের জারি করা দুর্যোগ ঘোষণায় বলা হয়েছে, এই প্রাদুর্ভাব টেক্সাসের কৃষি শিল্পের জন্য ‘আসন্ন ও ব্যাপক বিপদের’ কারণ হতে পারে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় অতিরিক্ত জনবল মোতায়েনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কানাডার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটির শীতল আবহাওয়ার কারণে সেখানে এই পরজীবী বড় ধরনের সমস্যা হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। কারণ অতীতে স্ক্রুওয়ার্ম সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে বিস্তার লাভ করেছে। তবু খামারিদের গবাদিপশুর ক্ষত এবং দুর্গন্ধযুক্ত বা তরল নির্গমন হওয়া কাটা জায়গাগুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া টেক্সাসে ভ্রমণ করলে পোষা প্রাণীগুলোকেও পরীক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে কানাডা।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে গবাদিপশুর বড় ধরনের বাণিজ্য রয়েছে। জবাই, প্রজনন, দুগ্ধ ও পশম উৎপাদনের জন্য নিয়মিত দুই দেশের মধ্যে পশু পরিবহন করা হয়। কানাডার কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ গরু আমদানি করেছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬৬ সালে স্ক্রুওয়ার্ম নির্মূল হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে এরপরও বিচ্ছিন্নভাবে সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে সত্তরের দশকের একটি প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্য। স্ক্রুওয়ার্মের লার্ভা পরিণত হয়ে মাছিতে রূপ নেয়, যা স্বল্প দূরত্বে উড়তে পারে। তবে দীর্ঘ দূরত্বে এদের বিস্তারের প্রধান মাধ্যম মানুষের মাধ্যমে স্থানান্তর।
গত ছয় দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এই পরজীবী দমনে কাজ করে আসছে। সবশেষ প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে মার্কিন কৃষি ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ শত শত কোটি জিনগতভাবে পরিবর্তিত বন্ধ্যা মাছি অবমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশুর শরীরে পরজীবী শনাক্ত করতে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘স্নিফার’ কুকুরও ব্যবহার করা হবে। তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এসব পদক্ষেপ সংক্রমণের বিস্তার পুরোপুরি ঠেকাতে যথেষ্ট হবে কি না তা এখনও নিশ্চিত নয়।
আরবিএন