দেশের সর্ববৃহৎ উচ্চশিক্ষা নেটওয়ার্ক হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী বা সনদসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে না; বরং জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুনাগরিক তৈরির অন্যতম প্রধান সূতিকাগারে পরিণত হবে। এটাই বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের মূল সংকল্প। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি টেকসই, বাস্তবসম্মত ও যুগান্তকারী কর্মপরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
রোববার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলামে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র এ কথা বলেন। গুরুত্বপূর্ণ এই শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, গত সাড়ে তিন মাসে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ব্যাপক সংস্কার ও কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে, তার মূল ভিত্তি হলো প্রধানমন্ত্রীর সুদূরপ্রসারী ভিশন এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো। তিনি বলেন, "আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশের উচ্চশিক্ষাকে শুধু প্রথাগত সনদনির্ভর করে রাখলে চলবে না। শিক্ষাকে যুগোপযোগী, কর্মমুখী, দক্ষতাভিত্তিক এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে হবে।"
সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে প্রতিটি কলেজে ক্যারিয়ার সেন্টার ও জব প্লেসমেন্ট কার্যক্রম চালু, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন শক্তিশালীকরণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাক-চাকরি অভিজ্ঞতা হিসেবে এপ্রেন্টিসশীপ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও তৃতীয় ভাষা শিক্ষার প্রসার ঘটানো হচ্ছে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের জন্য “লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস” কর্মসূচি, পরিবেশ সুরক্ষায় “ওয়ান স্টুডেন্ট ওয়ান ট্রি” উদ্যোগ এবং সামাজিক জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে খাল খননসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো একটি যোগ্য, দায়িত্বশীল, পরিবেশ সচেতন এবং আত্মনির্ভরশীল তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলা।
মাহদী আমিন আরও বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অতি স্বল্প সময়ে যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি ও অর্জনের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছে, তা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা ইতিমধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করছে এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কারের অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এই অগ্রযাত্রা ভবিষ্যতে আরও বেগবান হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকট তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতি বছর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিপুল সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাদের বড় একটি অংশ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সঠিক কর্মসংস্থান খুঁজে পায় না। ফলে তারা শিক্ষিত বেকারত্বের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়ে, যা পুরো জাতির জন্য এক বড় ক্ষতি। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত পরিবর্তন মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সংস্কার নয়; বরং সমগ্র বাংলাদেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং লক্ষ-লক্ষ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আগামী দিনের পুরো জাতির বিনির্মাণ ও সামগ্রিক অগ্রগতির প্রশ্ন।
উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজধানীকেন্দ্রিক বা শহরকেন্দ্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত একটি বিশাল উচ্চশিক্ষা নেটওয়ার্ক। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তিশালীকরণ মানেই প্রধানমন্ত্রীর মূল রাজনৈতিক দর্শন—অর্থাৎ তৃণমূলের শক্তিশালীকরণ, স্থানীয় সম্ভাবনার বিকাশ এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথকে সুদৃঢ় করা।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ শাসনামলে রাষ্ট্র কাঠামোর অন্যান্য অংশের মতো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, ধূলিসাৎ করা হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্যকেও। তবে জনগণের বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট সমস্যার দ্রুত সমাধান এবং মানসম্মত শিক্ষার সম্প্রসারণে বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ব্যবস্থা ও ফলাফল প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশন এবং বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে নিরাপদ ক্যাম্পাসে সেশনজট দ্রুত অপসারণকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি গৌরবময়, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার ইতিবাচক ফল শিক্ষার্থীরা শিগগিরই দেখতে পাবেন।
মাহদী আমিন বলেন, এই শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপান্তরের অভিযাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। শিক্ষকরাই হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষকদের হাত ধরেই দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা এমন একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে সক্ষম হব, যারা কেবল জ্ঞান অর্জনই করবে না, বরং কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করবে। প্রান্তিক জনপদ থেকে উঠে আসা এই লক্ষ-লক্ষ শিক্ষার্থী আগামী দিনের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এএসএম আমানুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।