মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়, কার্যকর কি হয়?

খন্দকার ওবায়দুল্লাহ

আইন-আদালত

মাত্র ১৬ দিনের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন

2026-06-07T21:37:24+00:00
2026-06-07T21:37:24+00:00
 
  রবিবার, ৭ জুন ২০২৬,
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
আইন-আদালত
মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়, কার্যকর কি হয়?
খন্দকার ওবায়দুল্লাহ
প্রকাশ: রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ৯:৩৭ পিএম   (ভিজিট : ২৭)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
মাত্র ১৬ দিনের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের আলোচনায় একটাই প্রশ্ন—এবার কি সত্যিই ফাঁসি কার্যকর হবে? 

বাংলাদেশে আলোচিত অনেক মামলায় বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেও সেই রায় কার্যকর হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। কখনও আপিল, কখনও ডেথ রেফারেন্স, কখনও রিভিউ, আবার কখনও আইনি জটিলতায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকে বিচারপ্রক্রিয়া। ফলে প্রশ্ন উঠছে—মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা কি ন্যায়বিচারের শেষ ধাপ, নাকি এটি দীর্ঘ আইনি যাত্রার শুরু?


রামিসা মামলায় দ্রুত বিচার, কিন্তু এরপর কী?
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ, হত্যা এবং পরে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করার ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঘটনার ভয়াবহতা, শিশুটির প্রতি চালানো নির্মম নির্যাতন এবং হত্যার নৃশংসতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বস্তরে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে।

সেই দাবির প্রেক্ষাপটে নজিরবিহীন গতিতে এগিয়েছে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম। ঘটনার মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করা হয়, অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়, অভিযোগ গঠন করা হয়, সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

দেশের বিচারিক ইতিহাসে এত স্বল্প সময়ে একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচার শেষ হওয়ার ঘটনা বিরল। ফলে অনেকেই এটিকে বিচার বিভাগের দক্ষতা ও দ্রুততার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকার অভিযোগের মধ্যে রামিসা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ও সন্তুষ্টি তৈরি করেছে।

তবে আদালতের এই রায় ঘোষণার মধ্য দিয়েই বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেই সেই দণ্ড সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা যায় না। বরং রায় ঘোষণার পর শুরু হয় আরও দীর্ঘ এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি আইনি প্রক্রিয়া।

আইন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের প্রতিটি রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদনের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানো হয়, যা ‘ডেথ রেফারেন্স’ নামে পরিচিত। হাইকোর্ট ওই রায়ের আইনগত বৈধতা, সাক্ষ্য-প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার যথার্থতা পর্যালোচনা করেন। হাইকোর্ট চাইলে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারেন, সাজা কমিয়ে দিতে পারেন কিংবা কোনো ক্ষেত্রে আসামিকে খালাসও দিতে পারেন।

এরপরও বিচারিক পথ শেষ হয় না। হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ থাকে। আপিল নিষ্পত্তির পর রিভিউ আবেদন করা যায়। সব বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে। এসব ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ উন্মুক্ত হয়।

ফলে রামিসা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর জনমনে যে স্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—এই রায় বাস্তবে কার্যকর হতে কত সময় লাগবে? বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে, অনেক আলোচিত মামলায় বিচারিক আদালত দ্রুত রায় দিলেও চূড়ান্তভাবে শাস্তি কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। বিশেষ করে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জটের কারণে বহু মৃত্যুদণ্ডের মামলা বছরের পর বছর উচ্চ আদালতে অপেক্ষমাণ থাকে।
এ কারণে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত বিচার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রায়ের পরবর্তী ধাপগুলোও দ্রুত সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় বিচারিক আদালতের দ্রুত রায়ের মাধ্যমে যে বার্তা সমাজে পৌঁছায়, দীর্ঘসূত্রতায় তা অনেকাংশে ম্লান হয়ে যেতে পারে।


আছিয়া ধর্ষণ মামলার উদাহরণ কী বলছে?
রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর অনেকের মনে স্বস্তি ফিরেছে। তবে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বাস্তবতা বোঝার জন্য আরেকটি আলোচিত মামলার দিকে তাকানো প্রয়োজন। সেটি হলো মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা।

গত ৬ মার্চ মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় আছিয়া। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে স্থানীয় হাসপাতাল, পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সবশেষে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। টানা কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ১৩ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশুটি।

আছিয়ার মৃত্যুর খবর প্রকাশ হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক অঙ্গন, মানবাধিকার সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিশুটির জন্য ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন হয়, মানববন্ধন হয়, প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। পুরো দেশ যেন এক কণ্ঠে দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছিল।

মাত্র ১৪ কার্যদিবসে তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক শেষ করে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ায় তখন অনেকেই এটিকে বিচার বিভাগের একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখেছিলেন।

কিন্তু সেই রায়ের পর কেটে গেছে এক বছরেরও বেশি সময়। তবুও মৃত্যুদণ্ড এখনো কার্যকর হয়নি। কারণ, বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার মধ্যেই বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায় না।

আছিয়া মামলার ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। রায় ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। কিন্তু এরপর থেকে মামলাটি উচ্চ আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে। এখনো ডেথ রেফারেন্সের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকলেও তা কার্যকর করার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি।

এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয় যে, দ্রুত বিচার আর দ্রুত শাস্তি কার্যকর—দুটি এক বিষয় নয়। নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচার শেষ করা সম্ভব হলেও উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। 

আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স এবং মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত আপিল মামলার সংখ্যা অনেক বেশি। পুরোনো মামলাগুলোর শুনানি শেষ হওয়ার আগে নতুন মামলাগুলো অনেক সময় তালিকায় অপেক্ষমাণ থাকে। ফলে আলোচিত কিংবা স্পর্শকাতর মামলাও বছরের পর বছর বিচারিক জটের মধ্যে আটকে যেতে পারে। 

আছিয়া মামলার অভিজ্ঞতা তাই রামিসা মামলার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। বিচারিক আদালত দ্রুততম সময়ে রায় দিলেও সেই রায় চূড়ান্তভাবে কার্যকর হতে কত সময় লাগবে? ভুক্তভোগী পরিবারকে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু দ্রুত রায় নয়, বরং ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও রিভিউসহ পরবর্তী বিচারিক ধাপগুলোও দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিচারিক আদালতের দ্রুত রায়ের মাধ্যমে যে বার্তা সমাজে যায়, দীর্ঘসূত্রতায় তার প্রভাব অনেকটাই কমে যেতে পারে।

আছিয়া মামলার এক বছর পরও যখন ফাঁসি কার্যকর হয়নি, তখন সেটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। আর সেই বাস্তবতাই নতুন করে আলোচনায় এসেছে রামিসা মামলার রায়ের পর।


মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কী কী ধাপ রয়েছে?
বাংলাদেশে বিচারিক আদালত কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলেই সেই রায় সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা যায় না। একজন ব্যক্তির জীবন নেওয়ার মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে আইন একাধিক স্তরে বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ রেখেছে। ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে বেশ কয়েকটি বাধ্যতামূলক আইনি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়।

প্রথমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, দায়রা জজ আদালত বা সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালত মামলার শুনানি শেষে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এরপর আইন অনুযায়ী সেই রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদনের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানো হয়, যা ‘ডেথ রেফারেন্স’ নামে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে আসামির কোনো আবেদন প্রয়োজন হয় না। 

হাইকোর্ট মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, তদন্ত, বিচারিক কার্যক্রম ও আইনি দিকগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেন। এই পর্যায়ে হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারেন, সাজা কমিয়ে দিতে পারেন অথবা কোনো ক্ষেত্রে আসামিকে খালাসও দিতে পারেন।

হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের পরও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয় না। আসামির সামনে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ থাকে। সেখানে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করা যায়। আপিল বিভাগে আবেদন খারিজ হলে আসামি রিভিউ আবেদন করতে পারেন। রিভিউয়ের মাধ্যমে আদালতের কাছে আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়।

সব বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপতি চাইলে সেই আবেদন গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন।

ডেথ রেফারেন্স, আপিল, রিভিউ এবং প্রাণভিক্ষাসহ সব আইনি সুযোগ শেষ হওয়ার পরই কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অর্থাৎ বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায়ই শেষ কথা নয়; এটি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মাত্র।


কেন বছরের পর বছর আটকে থাকে অনেক মামলা?
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লাগার অন্যতম কারণ হলো উচ্চ আদালতে মামলার জট।  আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক ডেথ রেফারেন্স এবং মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত আপিল মামলা বিচারাধীন রয়েছে। প্রতিটি মামলার সঙ্গে একজন মানুষের জীবন জড়িত থাকায় আদালতকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শুনানি করতে হয়। ফলে এসব মামলার নিষ্পত্তিতে স্বাভাবিকভাবেই সময় লাগে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, সাধারণত ডেথ রেফারেন্স ও আপিল মামলাগুলো ধারাবাহিক ক্রম অনুযায়ী শুনানি হয়। অর্থাৎ আগে আসা মামলার শুনানি শেষ হওয়ার পর পরবর্তী মামলার পালা আসে। ফলে নতুন আলোচিত মামলাগুলোও অনেক সময় পুরোনো মামলার দীর্ঘ সারির মধ্যে অপেক্ষা করতে থাকে।
এ কারণেই বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হলেও অনেক মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার মতো উদাহরণ এ বাস্তবতাই সামনে এনেছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু ধর্ষণ, শিশু হত্যা এবং ব্যাপক জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর জন্য পৃথক বেঞ্চ বা বিশেষ শুনানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে ডেথ রেফারেন্স দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থাও আরও বাড়বে।

তাদের মতে, দ্রুত বিচার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রায়ের পরবর্তী ধাপগুলোও দ্রুত সম্পন্ন হওয়া জরুরি। অন্যথায় আদালতের রায় এবং বাস্তব শাস্তির মধ্যে দীর্ঘ ব্যবধান তৈরি হয়, যা অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে।


কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা : সাড়ে চার মাসে বাংলাদেশের চিত্র 
রামিসা ও আছিয়ার মতো আলোচিত ঘটনাগুলো দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং দেশে কন্যাশিশুদের প্রতি চলমান যৌন সহিংসতার একটি উদ্বেগজনক বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে অন্তত ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ৪৬ জন কন্যাশিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যৌন সহিংসতার অনেক ঘটনা প্রাণহানিতেও গড়িয়েছে। এ সময়ে ১৪ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। এছাড়া ধর্ষণচেষ্টার পর আরও তিনজন কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। যৌন নির্যাতনের মানসিক ও সামাজিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অন্তত দুইজন কন্যাশিশু আত্মহত্যাও করেছে।

শুধু শিশু নয়, সার্বিকভাবে ধর্ষণের ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ মে পর্যন্ত সারা দেশে মোট ২ হাজার ২৪৩টি ধর্ষণ মামলা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে, রামিসা বা আছিয়ার মতো কয়েকটি আলোচিত ঘটনা জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করলেও বাস্তবে নারী ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা একটি ধারাবাহিক সামাজিক সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও কোনো শিশু বা নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কঠোর শাস্তির ঘোষণা নয়, অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত তদন্ত, বিচারিক প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় আলোচিত মামলাগুলোর বিচার হলেও নতুন নতুন ভুক্তভোগীর সংখ্যা কমানো কঠিন হবে। তাদের ভাষ্য, কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার এই পরিসংখ্যান শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়; এটি শিশুদের নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।


কঠোর শাস্তি, নাকি বিচারের নিশ্চয়তা— কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
অপরাধবিজ্ঞানী ও আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু শাস্তির কঠোরতা অপরাধ কমানোর একমাত্র উপায় নয়। অপরাধী যদি বিশ্বাস করে যে ধরা পড়বে না কিংবা বিচার হবে না, তাহলে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তিও অপরাধ প্রতিরোধে খুব বেশি কার্যকর হয় না। বরং অপরাধ শনাক্তকরণ, দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং শাস্তি কার্যকরের নিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা তৈরি করে।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বিচার দ্রুত হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ পর্যন্ত কার্যকরভাবে সম্পন্ন হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।



  বিষয়:   মৃত্যুদণ্ড  রায়  কার্যকর  ধর্ষণ  রামিসা আক্তার  আছিয়া ধর্ষণ  আইন 


Loading...
Loading...
আইন-আদালত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: