রোজ টিভি, পত্রিকায় চোখ রাখলেই দেখা যায়, পানিতে ডুবে মৃত্যুর খবর। সাঁতার না জানার কারণে দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪৬ জন শিশু-কিশোর পানিতে ডুবে মারা যায়। এ যেন এক অমোঘ নিয়তি।
ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১৭ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরির (বিএইচআইএস) মতে, দেশে অপঘাতে প্রতিবছর ৩০ হাজার শিশু মারা যায়, যার অর্ধেকই প্রাণ হারায় পানিতে ডুবে। ১ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের মধ্যে এই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে পুকুর, ডোবা, খাল-বিলের অভাব নেই। তারওপর বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা হয়। এতে মৃত্যুর পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
শিশুস্বাস্থ্য চিকিৎসক ডা. জহুরুল হক সাগর বলেন, 'সমাজ ও অভিভাবকদের অসচেতনতাই এই মৃত্যুর মুখ্য কারণ। গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ শিশু পানিতে পড়ে যখন মায়েরা রান্না বা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন। এই সুযোগে শিশুরা আপন মনে খেলতে খেলতে জলাধারের কাছে চলে যায় এবং দুর্ঘটনা ঘটে।'
তিনি বলেন, ‘৫ বছর বয়স থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানো উচিত। তাহলে এ দুর্ঘটনার হার কমে আসবে।’
২০০৫ সাল থেকে ইউনিসেফের সহযোগী সংগঠন 'সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ' (সিইপিআরবি) শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৩০ হাজার শিশুকে সাঁতার শিখিয়েছে। ইউনিসেফের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টি বিভাগের বাংলাদেশ প্রধান ব্রিথ লোকেটেলি-রসি জানান, তারা মূলত ৪ থেকে ১০ বছরের শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।
অস্ট্রেলিয়ান সাঁতার প্রশিক্ষক জেমস মনে করেন, একটি শিশুকে মাত্র ৯০ সেকেন্ড সাঁতার কাটা বা পানিতে ভেসে থাকা শেখাতে পারলেই, তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব।'
এদিকে বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'মাইকেল ব্লুমবার্গ ফাউন্ডেশন' ৭৭ কোটি টাকা সহায়তা দিচ্ছে। এই অর্থে দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ডে কেয়ার ও কমিউনিটি সেন্টারের মাধ্যমে ৮০ হাজার শিশুর সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কেলি হেনি জানান, কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিলেই এমন মৃত্যুর হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা সম্ভব।
এ ছাড়া গণমাধ্যমের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত এক যুগে কক্সবাজারের সাগরে ডুবে ৮৫ জন এবং সেন্ট মার্টিনে ১৪ জন পর্যটক মারা গেছেন। সাঁতার জানা থাকলে এই মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা যেত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অস্বাভাবিক মৃত্যু রোধে শুধু সাঁতার শেখানোই যথেষ্ট নয়, বরং সবাইকে সচেতন হতে হবে। স্কুলে শিশুদের সাঁতার শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, গণমাধ্যমে সাঁতারের গুরুত্ব নিয়ে নাটিকা, কার্টুন ও বিজ্ঞাপন প্রচার করার মাধ্যমে এই অপমৃত্যু রোধ করা সম্ভব।
/মহু