সিন্ডিকেট একটি নৈতিক অপরাধ

মিজানুর রহমান

ইসলাম

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে।

2026-06-10T15:02:24+00:00
2026-06-10T15:02:24+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬,
১৬ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
সিন্ডিকেট একটি নৈতিক অপরাধ
মিজানুর রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৩:০২ পিএম 
প্রতীকী ছবি
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা মানুষের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে। অর্থনৈতিক সুবিচারের ক্ষেত্রে ইসলাম সবসময় সাধারণ মানুষের কল্যাণের ওপর গুরুত্বারোপ করে। এই সুবিচার নিশ্চিত করতে ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যে জালিয়াতি, ধোঁকাবাজি এবং বিশেষ করে ‘সিন্ডিকেট’ বা ‘মজুদদারি’কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আধুনিক পরিভাষায় যাকে আমরা সিন্ডিকেট বলে জানি, ইসলামি পরিভাষায় তা হলো ‘আল-ইহতিকার’ বা অবৈধ মজুদদারি।

সিন্ডিকেট বা ইহতিকার কী?
অভিধান ও শরিয়াহর পরিভাষায় বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য গুদামজাত করে রাখা এবং দাম বৃদ্ধির অপেক্ষায় বসে থাকাকে সিন্ডিকেট বা ‘ইহতিকার’ বলা হয়। প্রথম আরবি অভিধান রচয়িতা খলিল ইবনে আহমদ আল-ফারাহিদি (রহ.) বলেন, ‘খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যজাত অন্যান্য জিনিস মজুদ করাকে ইহতিকার বলে।’ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর মতে, ‘নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও জনগণের প্রয়োজনে আসা খাদ্যদ্রব্য কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা এবং মূল্যবৃদ্ধির অপেক্ষায় থাকা হলো ইহতিকার বা সিন্ডিকেট।’ ইমাম আওজায়ি (রহ.)-এর ভাষায়, ‘যে ব্যক্তি পণ্য বাজারজাত করার পথে প্রতিবন্ধক হয়, সে-ই মজুদদার।’ অর্থাৎ পণ্যের স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে ভোক্তাকে জিম্মি করা এর মূল লক্ষ্য।

ইসলামি অর্থনীতিতে সিন্ডিকেটের অসারতা
ইসলামি অর্থনীতি মূলত মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও কল্যাণের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। ইসলাম অতিরিক্ত মুনাফালোভী প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, সিন্ডিকেট বা অবৈধ মজুদদারি ঈমানি চেতনার পরিপন্থী। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘শুধু পাপী ব্যক্তিই মজুদদারি বা সিন্ডিকেট করে থাকে’ (সহিহ মুসলিম : ১৬০৫)। ইসলামি আইনজ্ঞদের সর্বসম্মত মত হলো, যে পণ্যগুলো মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য, সেগুলো মজুদ করা হারাম। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে যখন জিগ্যেস করা হয়েছিল কোন জিনিস গুদামজাত করা নিষেধ, তিনি বলেছিলেন, ‘মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস; অর্থাৎ যেসব ক্ষেত্রে মানুষের জীবন ও জীবিকা জড়িত, সেসব ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করা হারাম।’

সিন্ডিকেট কেন হারাম
সিন্ডিকেট বা মজুদদারি হারাম হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো এটি সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম। কুরআন মজিদে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের কষ্ট দেওয়াকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যারা বিনা দোষে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা নিশ্চয়ই একটি বড় মিথ্যা অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৫৮)। যখন অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্যের দাম আকাশচুম্বী করে দেয়, তখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ চরম অসহায় হয়ে পড়ে। তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং অনেকে অনাহারে বা অর্ধাহারে দিন কাটাতে বাধ্য হয়। এই অমানবিক কর্মকাণ্ড সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিরতা ও দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে।

সিন্ডিকেটের বিভিন্ন ধরন ও ক্ষেত্র
সিন্ডিকেট শুধু খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বিভিন্ন রূপে সমাজে বিদ্যমান। যেমন- ১. কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি: বাজারে পণ্য থাকা সত্ত্বেও গুদামজাত করে সংকট তৈরি করা। ২. মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশা : দাম বাড়ার অপেক্ষায় পণ্য আটকে রাখা, যা সাধারণের ক্ষতি করে। ৩. সেবা খাতে সিন্ডিকেট : বর্তমান সময়ে শুধু পণ্য নয়, পরিবহন টিকেট বা অন্যান্য সেবা খাতেও সিন্ডিকেট দেখা যায়, যা সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মজুদদারদের ভয়াবহ পরিণাম
ইসলামে মজুদদারদের জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি ও অভিশাপের কথা বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমদানিকারক বা ব্যবসায়ী রিজিকপ্রাপ্ত (আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতপ্রাপ্ত), কিন্তু মজুদদার অভিশপ্ত’ (মুসনাদে দারেমি : ২৫৮৬)। অন্য এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্যদ্রব্য মজুদ করে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত করবেন অথবা দেউলিয়া বানাবেন’ (আল-মুন্তাখাবুল আদাবি : ১৭)। দুনিয়াবি লাভের আশায় যারা সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেয়, আখেরাতে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। তাদের এই হীন কর্মকাণ্ড তাদের প্রতি আল্লাহর লানত ও গজব ডেকে আনে। মোটকথা, একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সিন্ডিকেট বা মজুদদারি নির্মূল করা অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল ব্যবসায়িক নৈতিকতার পরিপন্থী নয়, বরং আল্লাহর আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। 

ব্যবসায়ীদের মনে রাখতে হবে, ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য কেবল মুনাফা অর্জন নয়, বরং মানুষের সেবা করা ও সততার সঙ্গে সম্পদ উপার্জন করা। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি কঠোর হাতে এই সিন্ডিকেট দমন করে এবং ব্যবসায়ীরা যদি ইসলামি নীতিবোধ মেনে চলেন, তবেই বাজারে পণ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।

এএডি/
Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: