মানুষের জীবনের অন্যতম প্রয়োজনীয় উপাদান হলো সম্পদ। এই সম্পদ অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর সঠিক ও পরিমিত ব্যয় করাও সমান জরুরি। ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ইসলামের সেই চিরায়ত নির্দেশনা হলো ‘মধ্যপন্থা’। ইসলাম অপচয় ও কৃপণতা উভয়কেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং এর মধ্যবর্তী পথকে অর্থাৎ মিতব্যয়িতাকেই উত্তম পন্থা হিসেবে নির্ধারণ করেছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘যারা ব্যয় করার সময় অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং তাদের পন্থা হয় এতদভয়ের মধ্যবর্তী’ (সুরা ফুরকান, আয়াত : ৬৭)। এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, সফল মুমিন তারাই, যারা খরচের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি বা অমিতব্যয়িতা করে না, আবার নিজের ও পরিবারের হক আদায়ে কার্পণ্যও করে না।
অপচয় ও শয়তানের সম্পর্ক
ইসলামে অপচয়কে অত্যন্ত কঠোরভাবে দেখা হয়েছে। মহান আল্লাহ অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই বলে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৭)। শয়তানের ভাই হওয়া বা তার গুণাবলি ধারণ করা একজন ঈমানদারের জন্য কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। এটি একটি নিকৃষ্টতম চারিত্রিক স্খলন। একইভাবে নিজের প্রয়োজনে ব্যয় করার পর অবশিষ্ট সম্পদ যদি অন্যায় বা লোক দেখানোর কাজে খরচ করা হয়, তবে সেটাও আল্লাহর অপছন্দনীয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)
দানেও মধ্যপন্থা রক্ষা করা
দান-সদকা ইসলামের একটি বড় ইবাদত। কিন্তু দানের ক্ষেত্রেও ইসলাম আবেগের চেয়ে বিবেক ও ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সব সম্পদ দান করে দিয়ে নিজে বা পরিবারের ওপর অভাব-অনটন ডেকে আনা ইসলামের শিক্ষা নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘নিজের হাত ঘাড়ের সঙ্গে বেঁধে রেখো না (অর্থাৎ কার্পণ্য করো না) এবং তা সম্পূর্ণ খুলে দিও না (অর্থাৎ সব খরচ করে ফেলো না); যার কারণে তোমাকে নিন্দাযোগ্য ও অসহায় হয়ে বসে পড়তে হবে’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৯)। অর্থাৎ নিজের সামর্থ্য বুঝে দান করতে হবে যাতে অন্যের সাহায্য না চেয়ে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা যায়।
সম্পদ আল্লাহর আমানত ও জবাবদিহিতা
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের কাছে থাকা প্রতিটি সম্পদ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর দেওয়া আমানত। মানুষ কেবল এর তত্ত্বাবধায়ক বা খলিফা। সুতরাং এই সম্পদ যেখানে-সেখানে খরচ করার অধিকার মানুষের নেই। কেয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জিত সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার আগপর্যন্ত আদম সন্তান তার স্থান থেকে নড়তে পারবে না। তন্মধ্যে তার ধন-সম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোন পথে ব্যয় করেছে তা অন্যতম’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৬)। তাই সম্পদ খরচের প্রতিটি ক্ষেত্র হতে হবে জায়েজ এবং পরিমিত। এমনকি ইবাদতের ক্ষেত্রেও অপচয় নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে, কেউ যদি বহমান নদীর তীরে বসেও ওজু করে, তবু তাকে অতিরিক্ত পানি খরচ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমাদের সমাজে মিতব্যয়িতা
বর্তমানে আমরা বিলাসিতা ও আভিজাত্যের প্রতিযোগিতায় পড়ে প্রচুর সম্পদ অপচয় করছি। বিয়েশাদি, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোকসজ্জা এবং প্রদর্শনীর নামে আমরা যে বিশাল অর্থের অপচয় করছি তা ইসলামের শিক্ষাবিরোধী।
অহেতুক সাজসজ্জা বা লোক দেখানোর জন্য খরচের বিষয়ে নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পানাহার করো, দান-সদকা করো এবং পোশাক পরিধান করো, তবে অহংকার ও অপচয় ছাড়া’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ৬৬৯৫)। আজকের পৃথিবীতে জ্বালানি সংকট, খাদ্যাভাব এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে মিতব্যয়িতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
অপচয় রোধই পারে আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে। ইসলাম আমাদের যে মধ্যপন্থার শিক্ষা দেয়, তা অনুসরণ করলে জীবনে প্রশান্তি আসে এবং সম্পদ বরকতময় হয়। আসুন, আমরা অপচয়ের পথ পরিহার করি এবং আমাদের আয়-ব্যয়ে পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা মেনে চলি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সম্পদকে বৈধ পথে ব্যয় করার এবং অপচয় থেকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন।