বর্তমান পৃথিবী যেন এক অন্তহীন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার অদম্য বাসনা, প্রাচুর্য অর্জনের তীব্র আকাক্সক্ষা এবং বিলাসিতার পেছনে অবিরাম ছুটে চলা আজকের মানুষের জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, অট্টালিকার উচ্চতা কিংবা সামাজিক প্রতিপত্তি দিয়েই যেন বর্তমানে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয়। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার গোলকধাঁধায় হারিয়ে আমরা কি আমাদের জীবনের প্রকৃত গন্তব্যের কথা ভুলে যাচ্ছি না?
আমরা কি কেবল এই নশ্বর পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী মোহে মগ্ন হয়ে চিরস্থায়ী পরকালকে গুরুত্বহীন করে ফেলছি না? পবিত্র কুরআন আমাদের এই ভয়াবহ গাফিলতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের বিভোর করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও।’ (সুরা তাকাসুর : ১-২)
প্রাচুর্য কেবল অর্থ-সম্পদ নয়, বরং সন্তান-সন্ততি, ক্ষমতা, পদমর্যাদা এবং জাগতিক সফলতার প্রতি তীব্র আসক্তিও এই প্রতিযোগিতার অংশ। এই আসক্তি মানুষকে এতটাই আচ্ছন্ন করে রাখে যে, সে ভুলে যায় মৃত্যুর অমোঘ সত্য এবং তার পরবর্তী জীবনের কঠিন জবাবদিহিতার কথা। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সতর্ক করে দিয়েছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল করে না দেয়’ (সুরা মুনাফিকুন : ৯)। যখন মানুষ সম্পদকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে, তখন তার হৃদয়ে আল্লাহর মহব্বতের জায়গা দখল করে নেয় পার্থিব বস্তুর মোহ। ফলে ইবাদত-বন্দেগিতে যেমন অলসতা আসে, তেমনি আখেরাতের প্রস্তুতির বদলে শুরু হয় দুনিয়া গড়ার নিরন্তর যুদ্ধ।
জীবন ধারণের জন্য অর্থের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইসলাম অর্থ উপার্জন করতে নিষেধ করে না, কিন্তু অর্থ যেন মানুষের অন্তরের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা জারি করেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য একটি পরীক্ষার বস্তু থাকে, আর আমার উম্মতের পরীক্ষার বস্তু হলো অর্থ-সম্পদ’ (তিরমিজি : ২৩৩৬)।
সম্পদের মোহ মানুষের চিন্তাশক্তিকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। মানুষ ভুলে যায় যে, এই সম্পদ তার অর্জিত হলেও শেষ পর্যন্ত তা অন্যের অধিকারে চলে যাবে। সম্পদ অর্জনের চেয়ে সেই সম্পদ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে তা নিয়ে বিচার দিবসে প্রতিটি মানুষকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের ভয় করি না, বরং ভয় করি এই যে, তোমাদের জন্য দুনিয়াকে অবারিত করে দেওয়া হবে এবং তোমরা তার মোহে মগ্ন হয়ে পড়বে, যা তোমাদের পূর্ববর্তীদের বিনাশ করেছে। (বুখারি : ৩১৫৮)
অতিরিক্ত লোভ ও মোহ দ্বীনকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। সম্পদের প্রতি এই লাগামহীন লালসা মানুষের নৈতিকতা ও আত্মিক স্বচ্ছতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একটি কালজয়ী হাদিসে রাসুল (সা.) সম্পদ ও পদমর্যাদার প্রতি মোহকে ক্ষুধার্ত বাঘের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা ছাগলের পালের ওপর আক্রমণ করলে যে ক্ষতি হয়, তার চেয়েও মারাত্মকভাবে মানুষের ঈমান ও নেক আমলকে নষ্ট করে দেয় (তিরমিজি : ২৩৭৬)।
সুতরাং সম্পদের পেছনে ছুটতে গিয়ে যদি সালাত, সাওম, দান-সদকা ও হালাল-হারামের বাছবিচার হারিয়ে যায়, তবে সেই সাফল্য পরিণামে চরম ব্যর্থতা ডেকে আনে। প্রাচুর্যের মোহ যেন আমাদের চিরন্তন সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সম্পদ ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা যেন তাঁর ভালোবাসার চেয়ে বেশি না হয়ে যায়, সেই তওফিক দান করুন। প্রাচুর্যের নেশায় নয়, বরং স্রষ্টার ইবাদত ও মানুষের সেবায় জীবন অতিবাহিত করাই হোক আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।