মহান আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার মালিক। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই এই পৃথিবী আল্লাহর’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১২৮)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘বলুন, হে আল্লাহ! আপনিই সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজত্ব ছিনিয়ে নেন। যাকে ইচ্ছা আপনি সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছা করেন লাঞ্ছিত’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ২৬)। প্রিয়নবী (সা.)-এর আদর্শিক উত্তরাধিকার ও খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনব্যবস্থায় এই নবুয়তি দর্শনই পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়েছিল।
অর্ধ-পৃথিবীর মালিক খলিফা ওমর (রা.)-এর সুশাসনের অনন্য নজির বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। জেরুজালেম বিজয়ী আমিরুল মুমিনিন উটের রশি টেনে হেঁটে চলেছেন, এমন দৃশ্য ইসলামের ন্যায়পরায়ণতার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘ওই ফোরাতের কূলে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায়, তা হলে আমি ওমরকে আল্লাহর সমীপে জবাবদিহি করতে হবে!’ এমনিভাবে মুহাম্মদ ইবনে নাসর বিজয়ী বেশে স্পেনের গ্রানাডায় প্রবেশকালে তাকে স্বাগত জানিয়ে সমবেত জনতার উল্লাসধ্বনি ছিল ‘মারহাবান লিন-নাসর’ বা আল্লাহর কৃপায় বিজয়ীকে স্বাগত। এর জবাবে তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘লা গালিবা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ যদি আল্লাহ না চান তবে কেউ বিজয়ী নয়। ১২০৪-০৫ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খলজি ঝাড়খণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি বনাঞ্চল দিয়ে বাংলায় অভিযান পরিচালনা করেন। লক্ষ্মণসেনের পাহারাদাররা স্রেফ সাধারণ ঘোড়া বিক্রেতা ছাড়া কিছুই মনে করেনি তাকে। এরপর ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জুন কুতুবুদ্দিন আইবেক দিল্লির সালতানাতে অভিষিক্ত হন। সে যুগের প্রথমদিকের শাসককে ‘মামলুক’ বা ক্রীতদাস বলা হতো। এমনকি মোগল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানও ছিলেন এককালের ক্রীতদাসী।
ইসলামি নেতৃত্ব শাসক হিসেবে নয়, বরং জনকল্যাণে প্রকৃত ‘সেবক’ হতে অনুপ্রাণিত করে। জনমতের প্রত্যাশা পূরণে সর্বসাধারণের অগ্রাধিকার এবং পরামর্শের নীতি ইসলামে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর নির্দেশ, ‘প্রত্যেক কাজে তাদের সঙ্গে (পারস্পরিক) পরামর্শ করো’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)। মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, ন্যায়ভিত্তিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতদারিতা এবং পরমতসহিষ্ণুতা জনআকাক্সক্ষা পূরণে অত্যন্ত সহায়ক। মহান আল্লাহ আরও নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন, আমানতগুলো তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও এবং যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করো, তখন ইনসাফের সঙ্গে বিচার করো’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)। প্রিয়নবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্বাধীন বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বুখারি)
কর্মবিমুখিতা, ভোগবাদী মানসিকতা কিংবা পরমুখাপেক্ষিতা নয়, বরং ইসলামের মূল আদর্শ হলো শ্রম ও মেধার যোগ্যতা। পবিত্র কুরআনের ৭৫৬টি আয়াতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশ্লেষণ ইসলামের জ্ঞানমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, ‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৯)। পবিত্র কুরআনের অন্য জায়গায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ায় একে অপরের সাহায্য করো’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ২)। আরও বলা হয়েছে, ‘যাকে জ্ঞান দান করা হয়েছে তাকে প্রভূত কল্যাণ দান করা হয়েছে’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬৯)।
মেধা ও যোগ্যতা হলো মানুষের প্রকৃত কর্মনৈপুণ্যের মূল মানদণ্ড। সুরা কাসাসে বলা হয়েছে, ‘ভালো সে কর্মচারী হবে নিশ্চয়, যে শক্তিশালী ও বিশ্বাসী রয়।’ (আয়াত : ২৬)
দায়িত্বশীল পদ কখনো কোনো অযোগ্য বা অপদার্থ ব্যক্তির জন্য হতে পারে না। প্রিয়নবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘যখন দায়িত্ব বা আমানত অযোগ্য ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে, তখন কেয়ামতের বা ধ্বংসের অপেক্ষা করো’ (বুখারি)। মানুষের প্রতিভা প্রসঙ্গে প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, ‘স্বর্ণ ও রুপার খনির ন্যায় মানুষও খনিতুল্য’ (মুসলিম)। পবিত্র কুরআনের ঘোষিত নীতি হলো, ‘লা তাজলিমুনা ওলা তুজলামুন, অর্থাৎ অন্যের ওপর অত্যাচার করো না, তোমাদের ওপরও অত্যাচার করা হবে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৯)
নারী, বিধবা, এতিম, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের টিকে থাকার সহায়তা প্রদান নিছক কোনো কল্যাণমুখী প্রণোদনা নয়, বরং এটি ইসলামি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অপরিহার্য অংশ। সুরা তওবার ৬০ নম্বর আয়াতে অনগ্রসর মানুষদের আটটি খাতে শ্রেণিবদ্ধ করে জাকাতের আওতায় আনা হয়েছে। এটি একটি সুদমুক্ত, জাকাতভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজের স্পষ্ট ধারণা দেয়। পাশাপাশি সুরা জারিয়াতের ১৯ নম্বর আয়াত সমাজের ‘বঞ্চিত ও মুখাপেক্ষী’ মানুষের বেঁচে থাকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করে। বস্তুত ইসলামে একের ভোগাকাক্সক্ষায় অন্যের ভোগান্তি কস্মিনকালেও সমর্থিত নয়। মহান আল্লাহ মানবতা ও ঐক্যের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যেয়ো না’ (সুরা আল-ইমরান, আয়াত : ১০৩)।
প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিজ মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ও ঘৃণা করা অন্যায়। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য তার রক্ত, সম্পদ ও সম্মান সবই পবিত্রতম’ (মুসলিম)। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমি নির্দেশ দিচ্ছি, দলবদ্ধ জীবন, নেতার আদেশ শ্রবণ ও আনুগত্যের...।’ (তিরমিজি)
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর
সময়ের আলো/জেডআই