পরকালে কার ঠিকানা কোথায় হবে

মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া

ইসলাম

আল্লাহ তায়ালা এই মহাবিশ্বে যত মাখলুক বা সৃষ্টিজীব জন্ম দিয়েছেন, তাদের সবার জীবিকা বা রিজিকের সুব্যবস্থা একমাত্র তাঁর নিজ জিম্মাতেই

2026-07-24T15:30:15+00:00
2026-07-24T15:30:15+00:00
 
  শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬,
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
ইসলাম
পরকালে কার ঠিকানা কোথায় হবে
মাওলানা কাওসার আহমদ যাকারিয়া
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬, ৩:৩০ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
আল্লাহ তায়ালা এই মহাবিশ্বে যত মাখলুক বা সৃষ্টিজীব জন্ম দিয়েছেন, তাদের সবার জীবিকা বা রিজিকের সুব্যবস্থা একমাত্র তাঁর নিজ জিম্মাতেই রেখেছেন। এই ধরণিতে মানুষের বিশ্বাসের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো মানুষই আল্লাহর রহমত ও রিজিক থেকে বঞ্চিত হয় না। অবারিত এই রিজিক বণ্টনে রয়েছে এক অপূর্ব বৈচিত্র্য ও সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা। দুনিয়ার বুকে সবাই সমপরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয় না; বরং কারও জীবন কাটে অপার সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যে, আবার কারও জীবন জর্জরিত হয় তীব্র অভাব ও দারিদ্র্যের কশাঘাতে। পার্থিব জীবনের এই ব্যবধান কোনো অন্ধ নিয়ম বা আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি আল্লাহর সুমহান প্রজ্ঞা ও সৃষ্টি-রহস্যের এক অনিবার্য অংশ। বান্দার প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করেই তিনি কাউকে বাড়িয়ে দেন, আবার কাউকে পরিমিত দান করেন। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি আল্লাহ তাঁর সব বান্দাকে প্রচুর রিজিক দিতেন, তা হলে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা, সেই পরিমাণ রিজিক অবতীর্ণ করেন’ (সুরা শূরা, আয়াত : ২৭)। 

অন্য একটি আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘আমিই পার্থিব জীবনে তাদের জীবিকা বণ্টন করে রেখেছি এবং তাদের একজনের মর্যাদা অন্যজনের ওপর উন্নীত করেছি, যাতে তারা একে অন্যকে সেবকরূপে গ্রহণ করতে পারে।’ (সুরা জুখরুফ, আয়াত : ৩২)।

মানুষের রিজিকের এই তারতম্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং পরকালীন কল্যাণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যারা যতবেশি আমল করবে, তারা পরকালে ততবেশি উপকৃত হবে এবং ততবেশি সম্মানের অধিকারী হবে। পৃথিবীতে রিজিকে যেমন তারতম্য থাকে, তেমনি পরকালেও প্রতিদানে তারতম্য থাকবে। জান্নাতেও থাকবে বিভিন্ন স্তরবিন্যাস। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘জান্নাতের ১০০ স্তর রয়েছে। প্রতি দুই স্তরের মধ্যে রয়েছে একশ বছরের ব্যবধান’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৫২৯)। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘জান্নাতের বাসিন্দারা জান্নাতের সুউচ্চ প্রাসাদগুলো ওপর দিকে দেখতে পাবে, যেমন দূরবর্তী উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো তোমরা আকাশের পূর্ব বা পশ্চিম কোণে স্পষ্ট দেখতে পাও। কেননা তাদের পরস্পরের সম্মানের ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকবে। এ কথা শুনে সাহাবিরা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এ স্তরগুলো তো নবীদের জন্য নির্ধারিত। তাদের ছাড়া অন্য কেউ তো এ স্তরে কখনো পৌঁছতে পারবে না। এর জবাবে তিনি বলেন, কেন পারবে না, অবশ্যই পারবে। যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ! যেসব মানুষ আল্লাহর ওপর ঈমান আনে ও তাঁর রাসুলের প্রতি আস্থা স্থাপন করে, তারা সবাই এ মর্যাদাসম্পন্ন স্তরগুলোতে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৬৮৮১)।

পরকালে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের জন্য অবিশ্বাসীদের ওপর সাধারণ মর্যাদা ও সম্মান ঘোষণা করবেন। কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘যারা তাঁর কাছে উপস্থিত হবে মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আছে সুউচ্চ মর্যাদা, স্থায়ী জান্নাত- যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা স্থায়ী হবে এবং এ পুরস্কার তাদেরই যারা পবিত্র’ (সুরা তোয়াহা, আয়াত : ৭৫-৭৬)। পৃথিবীতে যে যেমন আমল করবে, জান্নাতে তার অবস্থান ও স্তর সে অনুপাতে নির্ধারিত হবে। প্রত্যেকের আমল অনুসারে নির্ধারিত হবে তার মর্যাদার স্তর। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয়, অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে নিজের সম্পদ ও জীবন দিয়ে সংগ্রাম করে তারা সমান নন। যারা নিজের সম্পদ ও জীবন দ্বারা সংগ্রাম করে, যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন; আল্লাহ সবাইকে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’ (সুরা নিসা : ৯৫) জান্নাতে সাধারণ মানুষের ভেতর যেমন মর্যাদার পার্থক্য হবে, তেমন নবীদের মতো বিশেষ স্তরেও থাকবে মর্যাদার তারতম্য। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এই রাসুলগণ, তাঁদের মধ্যে কাউকে কারও ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। তাঁদের মধ্যে এমন কেউ রয়েছে, যাঁর সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেছেন, আবার কাউকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন।’ (সুরা বাকারা : ২৫৩)।


জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর জান্নাতুল ফিরদাউস। নবীজি (সা.) মুমিনদের এই স্তর কামনা করতে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে চাইলে ফিরদাউস চাইবে। কেননা এটাই হলো সবচেয়ে উত্তম ও সর্বোচ্চ জান্নাত। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.) এটাও বলেছেন, এর ওপরে আছে দয়াময়ের আরশ। আর সেখান থেকেই জান্নাতের নহরগুলো প্রবাহিত হচ্ছে’ (বুখারি : ২৭৯০)। সর্বোচ্চ জান্নাত যারা পাবে তাদের কথা পবিত্র কুরআনে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনরা, যারা বিনয়-নম্র নিজেদের নামাজে, যারা অসার কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে, যারা জাকাত দানে সক্রিয়, যারা নিজের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে নিজেদের স্ত্রী বা অধিকারভুক্ত দাসীরা ছাড়া- এতে তারা নিন্দনীয় হবে না, আর কেউ এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা হবে সীমালঙ্ঘনকারী; যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, যারা নিজেদের নামাজে যত্নবান থাকে, তারাই হবে ফিরদাউসের অধিকারী, যাতে তারা চিরস্থায়ী হবে।’ (সুরা মুমিনিনুন : ১-১১)।

পরকালে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর জান্নাতুল ফিরদাউসে নবী-রাসুলদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও থাকবে। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি আমার কাছে আমার প্রাণ ও পরিবার অপেক্ষাও বেশি প্রিয়। যখন বাড়িতে থাকি আর আপনার কথা মনে পড়ে, নিজেকে একদম ধরে রাখতে পারি না। ছুটে এসে আপনাকে দেখে তবে শান্ত হই। যখন আমার ও আপনার মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়, তখন চিন্তা করি আপনি তো জান্নাতে প্রবেশ করে নবীদের সঙ্গে উচ্চস্থানে চলে যাবেন। আর আমি যদি জান্নাত লাভ করতে পারি, আশঙ্কা হয় আপনাকে দেখতে পাব না (যেহেতু আমার স্থান থাকবে অনেক নিচে)। তখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়, ‘যারা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করবে, তারা সেসব লোকের সঙ্গে থাকবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাৎ নবী-রাসুল, সিদ্দিকিন, শহিদ ও সালেহিনদের সঙ্গে। কতই না উত্তম সঙ্গী তারা’ (সুরা নিসা : ৬৯; তাফসিরে কুরতুবি)। 

যেসব লোক আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশিত বিষয়ের ওপর আমল করবে এবং আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বিরত
থাকবে, তাদের পদমর্যাদা তাদেরই আমল তথা কৃতকর্ম অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। প্রথম শ্রেণির লোকদের আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসুলগণের সঙ্গে জান্নাতের উচ্চতর স্থানে জায়গা দেবেন এবং দ্বিতীয় শ্রেণির লোকদের নবীগণের পরবর্তী মর্যাদার লোকদের সঙ্গে স্থান দেবেন। তাদেরই বলা হয় ছিদ্দিকিন। অর্থাৎ তাঁরা হলেন সুউচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবায়ে কেরাম, যাঁরা কোনো রকম দ্বিধা-সংকোচ ও বিরোধিতা না করে প্রাথমিক পর্যায়েই ঈমান এনেছেন। যেমন হজরত আবু বকর ছিদ্দিক (রা.)। অতঃপর তৃতীয় শ্রেণির লোকেরা থাকবেন শহিদগণের সঙ্গে। শহিদ সেসব লোককে বলা হয়, যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের জান-মাল কুরবান করে দিয়েছেন। আর চতুর্থ শ্রেণির লোক থাকবেন সালেহিনদের সঙ্গে। সালেহিন ওইসব লোক, যারা বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক, প্রকাশ্য ও গোপন সব ক্ষেত্রেই সৎকর্মগুলোর যথাযথ অনুবর্তী। সারকথা, আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যশীল বান্দাগণ সেসব মহান ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকবে, যারা আল্লাহ তায়ালার কাছে সর্বাধিক সম্মানিত ও মকবুল।

সর্বনিম্ন জান্নাত ও তার অধিকারী সম্পর্কেও আমরা জানতে পারি হাদিস থেকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, নিম্নতম জান্নাতি ওই ব্যক্তি, যার মুখমণ্ডলটি আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামের দিক থেকে সরিয়ে জান্নাতের দিকে করে দেবেন। তার সামনে একটি ছায়াযুক্ত গাছ উদ্ভাসিত করা হবে। সে ব্যক্তি প্রার্থনা জানাবে, হে প্রতিপ্রালক, আমাকে এ গাছ পর্যন্ত এগিয়ে দিন। আমি এ ছায়ায় অবস্থান করতে চাই। 

তখন আল্লাহ তাকে বিভিন্ন নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবেন, এটি চাও। এভাবে যখন তার সব আকাক্সক্ষা সমাপ্ত হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ বলবেন, যাও তোমাকে এসব সম্পদ প্রদান করলাম, সেই সঙ্গে আরও ১০ গুণ দান করলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তখন লোকটি জান্নাতে তার গৃহে প্রবেশ করবে। তার সঙ্গে ডাগর আঁখিবিশিষ্ট দুজন হুর স্ত্রী হিসেবে প্রবেশ করবে। আর তারা বলবে, সব প্রশংসা সে আল্লাহর জন্য, যিনি আপনাকে আমাদের জন্য এবং আমাদের আপনার জন্য সৃষ্টি করেছেন। লোকটি বলবে, আমাকে যা দেওয়া হয়েছে, এমন আর কাউকে দেওয়া হয়নি। (মুসলিম : ৩৫২)।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   পরকাল  ঠিকানা  কোথায় হবে  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: