আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশে কর্মরত মার্কিন ব্যবসায়ীদের সংগঠন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটি এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানায়।
সংগঠনটি বলেছে, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। অ্যামচেমের মতে, সরকার আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা ইতিবাচক।
সংগঠনটি বলেছে, জিডিপির ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ সমপরিমাণ বাজেট ঘাটতি তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও গ্রহণযোগ্য। তবে এই ঘাটতি অর্থায়নে দেশীয় ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত করতে পারে এবং ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে।
রাজস্ব আহরণের বিষয়ে অ্যামচেম বলেছে, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কর প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন, কর পরিপালন বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চলমান উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ঋণনির্ভরতা কমাতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে করনীতি প্রণয়ন ও কর প্রশাসনের কার্যক্রম পৃথক করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনারও আহ্বান জানিয়েছে অ্যামচেম।
সামাজিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রশংসা করে সংগঠনটি বলেছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বাড়তি বরাদ্দ ইতিবাচক পদক্ষেপ। বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা খাতে এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দকে স্বাগত জানিয়েছে তারা। তবে এসব খাতে কেবল বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সেবার মান, সুশাসন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করাকে অবকাঠামো ও সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছে অ্যামচেম। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে প্রকল্প প্রস্তুতি, মূল্যায়ন এবং ফলাফলভিত্তিক নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দিয়েছে সংগঠনটি।
রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও বাণিজ্য সহজীকরণে কিছু আমদানি ও রপ্তানিসংক্রান্ত কর হ্রাসের উদ্যোগকেও স্বাগত জানিয়েছে অ্যামচেম। সংস্থাটির মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে কাঠামোগত সংস্কার, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
জ্বালানি খাতের বিষয়ে অ্যামচেম বলেছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য প্রণোদনা টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশীয় জ্বালানি সম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অ্যামচেমের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা ও প্রবৃদ্ধির জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং সরকার-বেসরকারি খাতের মধ্যে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বের ওপর। সংগঠনটি জানিয়েছে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অ্যামচেম বাংলাদেশ।