পুঁজিবাজারে বিনিয়োগবান্ধব নানা পদক্ষেপ থাকলেও নেই প্রণোদনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ

2026-06-11T21:55:28+00:00
2026-06-11T21:55:28+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬,
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগবান্ধব নানা পদক্ষেপ থাকলেও নেই প্রণোদনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৯:৫৫ পিএম   (ভিজিট : ৫)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারের কাঠামোগত উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, দেশের পুঁজিবাজারকে আরও গভীর, স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক এবং আস্থাভিত্তিক বাজারে পরিণত করতে সরকার মূলধন সংগ্রহ সহজীকরণসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনুমোদন ও পরিপালন-সংক্রান্ত অস্পষ্টতা দূর করা হবে। এর ফলে দেশের বড় ও মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর শেয়ারবাজারে আসার পথ সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাজেটে আরও জানানো হয়েছে, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়াকে সময়নির্ধারিত, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। আবেদন দাখিল, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, ফি পরিশোধ, সংশোধন এবং অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ইস্যুকারী কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও গতি বৃদ্ধি পেলে নতুন ও ভালো কোম্পানির বাজারে আগমন বাড়বে। এতে একদিকে যেমন বাজার মূলধন বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

করপোরেট কর অপরিবর্তিত

পুঁজিবাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল করপোরেট করহার। বাজেটে বিদ্যমান করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য মধ্যমেয়াদে কর-নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান করহার বহাল রাখা হবে। 

বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, করহারে হঠাৎ পরিবর্তন না হওয়ায় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা আরও স্থিতিশীলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও কিছুটা বাড়বে।

উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণনার সুবিধা

বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো উৎসে কর কর্তনকে আর ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচনা না করে অগ্রিম কর হিসেবে গণনা করা হবে। অতিরিক্ত কর পরিশোধের ক্ষেত্রে ফেরত পাওয়ার সুযোগও থাকবে। 

ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মতে, এই পদক্ষেপ কোম্পানিগুলোর নগদ প্রবাহের ওপর চাপ কমাবে। ফলে উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে পেনশন তহবিল, বীমা কোম্পানি, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা হবে।

বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের আধিপত্য বেশি থাকায় বাজারে অস্থিরতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লে বাজারে স্থিতিশীলতা ও তারল্য উভয়ই বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বন্ড বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ

শেয়ারবাজারের পাশাপাশি দেশের পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক করার লক্ষ্যে কর্পোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজেটে স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পৌর বন্ড (মিউনিসিপেল বন্ড) চালুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নের জন্য বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো তহবিল এবং অন্যান্য আধুনিক অর্থায়ন উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজারে শেয়ারনির্ভর বিনিয়োগের আধিক্য থাকলেও বন্ড বাজারের বিকাশ খুব সীমিত। ফলে কর্পোরেট বন্ড, পৌর বন্ড ও সুকুকের মতো বিকল্প বিনিয়োগ পণ্য চালু হলে বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হবে।

পুঁজিবাজার কী পেল?

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজার সরাসরি বড় ধরনের কর প্রণোদনা না পেলেও বাজার সংস্কার, আইপিও প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তি সহজ করা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বন্ড বাজার সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত উদ্যোগ পেয়েছে। 

পাশাপাশি প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রিক যানবাহন ও ডিজিটাল শিল্পে কর-সুবিধা ভবিষ্যতে নতুন খাতভিত্তিক কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে সহায়ক হতে পারে। ফলে স্বল্পমেয়াদে বড় কোনো প্রণোদনা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজারের গভীরতা, স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে এবারের বাজেটে।

বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হলো?

তবে বাজারসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করেন, বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য প্রত্যক্ষ কোনো প্রণোদনা নেই। লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর সুবিধা বৃদ্ধি, মূলধনী মুনাফা কর পুনর্বিবেচনা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা কিংবা বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির বাধ্যবাধকতা এসব বিষয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য ঘোষণা আসেনি।

তাদের মতে, বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন ও বাজার মূলধন উভয়ই চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে আরও নির্দিষ্ট ও সরাসরি পুঁজিবাজারবান্ধব পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।

সার্বিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে পুঁজিবাজারের জন্য “পরোক্ষভাবে ইতিবাচক” বলা যায়। করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা, উৎসে কর ব্যবস্থার সংস্কার, প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে কর সুবিধা, বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে প্রণোদনা এবং নতুন ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।

তবে বাজারে তাৎক্ষণিক গতি আনতে যেসব প্রত্যক্ষ প্রণোদনার আশা করেছিলেন বিনিয়োগকারীরা, সেগুলোর অনেকটাই এবারের বাজেটে অনুপস্থিত। ফলে এখন নজর থাকবে বাজেটের ঘোষণাগুলোর বাস্তবায়ন এবং এসব উদ্যোগ কতটা দ্রুত নতুন বিনিয়োগ ও নতুন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে পারে তার ওপর।


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: