পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। লোকসভা ও বিধানসভা—উভয় স্তরেই একাধিক সাংসদ ও বিধায়কের দলত্যাগের ইঙ্গিত এবং আলাদা গোষ্ঠী গঠনের প্রচেষ্টা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দলের প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিতে চলেছেন বলে সূত্রের খবর, যা তৃণমূলের অন্দরমহলে নেতৃত্ব সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা ঘিরে চর্চা
সূত্রের দাবি, ছয়বারের লোকসভা সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এই বৈঠকের পর থেকেই তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জল্পনা তীব্র হয়। দলীয় অন্দরের একটি অংশ মনে করছে, তিনি শীঘ্রই বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের শিবিরে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিতে পারেন এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের দায়িত্বও পেতে পারেন।
বর্তমানে বিদ্রোহী শিবিরের নেতৃত্বে রয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তবে তার নেতৃত্ব নিয়ে শিবিরের ভেতরে মতভেদ তৈরি হয়েছে বলেও সূত্রের খবর। একাংশের দাবি, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ সাংসদ এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে এলে সাংগঠনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শক্তি বৃদ্ধি
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত ১৯ থেকে ২২ জন লোকসভা সাংসদ তাদের সঙ্গে রয়েছেন। সম্প্রতি একটি তালিকায় ১৯ জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রকাশ্যে আসে, যার পর নতুন করে আরও কিছু সাংসদের সমর্থন যুক্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এছাড়া, ৬০-এর বেশি বিধায়কও তৃণমূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বলে সূত্রের দাবি। এই বিধায়করা বিধানসভায় আলাদা অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি দলীয় নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবিও তুলছেন।
বিদ্রোহী সাংসদদের লক্ষ্য লোকসভায় আলাদা তৃণমূল গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এবং স্পিকারের মাধ্যমে পৃথক ককাস গঠন করা। এই উদ্দেশ্যে কাকলি ঘোষ দস্তিদার সোমবার লোকসভার স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে আনুষ্ঠানিক আবেদন জানানোর কথা রয়েছে।
এনডিএর সঙ্গে সমীকরণের সম্ভাবনা
রাজনৈতিক মহলে আরও জল্পনা, বিদ্রোহী তৃণমূল গোষ্ঠী ভবিষ্যতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএকে সমর্থন করতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবুও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
দলীয় প্রতিক্রিয়া ও তীব্র আক্রমণ
তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্ব এই বিদ্রোহকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছে। দলের একাধিক নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে “বিশ্বাসঘাতক” বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, তিনি দল ও ভোটারদের আস্থার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং রাজনৈতিক সুবিধার জন্য অবস্থান পরিবর্তন করছেন।
একইসঙ্গে দলের ভেতরে ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সূত্রের মতে, বিদ্রোহের বড় অংশ তাঁর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই গড়ে উঠেছে। যদিও প্রকাশ্যে অনেক নেতা এখনো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছেন, দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিধানসভাতেও বিদ্রোহের ছায়া
শুধু লোকসভা নয়, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাতেও একই ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিদ্রোহী বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৪ জন তার শিবিরে রয়েছেন এবং তারা ফ্লোর টেস্টে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে প্রস্তুত।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস এখন তার ইতিহাসের অন্যতম বড় অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। লোকসভা ও বিধানসভা— দুই ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব বিভাজন দলের সাংগঠনিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
/ইউএমএইচ