রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে এবার নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যুক্তরাজ্য। রোববার ভোরে ইংলিশ চ্যানেলে ৬ ঘণ্টা কমান্ডো অভিযান চালিয়ে রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’র একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার আটক করেছে ব্রিটিশ বাহিনী। যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে এ ধরনের অভিযান এই প্রথম।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নিজেই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, ভোররাতে তিনি সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ দেন ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রমের চেষ্টা করা একটি নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেলবাহী ট্যাঙ্কার আটক করতে। তার ভাষায়, এই অভিযান শুধু রাশিয়ার জন্য আরেকটি বড় ধাক্কাই নয়, বরং ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর অর্থ জোগানদাতাদের প্রতিও একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
আটক হওয়া জাহাজটির নাম ‘স্মির্টোস’। ক্যামেরুনের পতাকাবাহী এ ট্যাঙ্কারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রুশ তেল পরিবহনের অভিযোগ ছিল। সে কারণেই গত বছর যুক্তরাজ্য জাহাজটিকে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করে। জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, ৫ জুন এটি রাশিয়ার লুগা উপসাগরের একটি বন্দরে অবস্থান করছিল। ছয় দিন পর বাল্টিক সাগর ত্যাগ করে মিসরের পোর্ট সাঈদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
অভিযানটি ছিল ব্যাপক ও সুপরিকল্পিত। রয়্যাল মেরিন কমান্ডো, ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সির কর্মকর্তারা এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা প্রায় ৬ ঘণ্টা ধরে অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের সহায়তা দেয় মেরিটাইম এয়ার গ্রুপের বিমান, রয়্যাল এয়ারফোর্সের পি-৮ নজরদারি উড়োজাহাজ এবং যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস সাদারল্যান্ড ও এইচএমএস লেডব্রি।
বর্তমানে স্মির্টোসকে ডরসেট উপকূলের ওয়েমাউথের কাছে নোঙর করে রাখা হয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জাহাজটিতে পরিবেশগত বা নিরাপত্তাজনিত কোনো ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর থেকে ‘শ্যাডো ফ্লিট’ আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সাধারণত তৃতীয় দেশের পতাকা ব্যবহারকারী এসব জাহাজের মাধ্যমে গোপনে রুশ তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের দাবি, বর্তমানে সাত শতাধিক ট্যাঙ্কার এই নেটওয়ার্কের অংশ এবং রাশিয়ার নিষিদ্ধ ঘোষিত তেলের প্রায় ৭৫ শতাংশই এসব জাহাজে পরিবাহিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহে এই বহর রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্য বলছে, শ্যাডো ফ্লিট মোকাবিলায় তারা বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় দেশ। এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে লন্ডন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, এসব পদক্ষেপের ফলে ২০২৫ সালে তেল ও গ্যাস খাত থেকে রাশিয়ার আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে।
এদিকে এই ব্রিটিশ আটক অভিযানের প্রশংসা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার ভাষ্যমতে, শুধু ট্যাঙ্কার আটক করলেই হবে না; ইউরোপের উচিত এমন আইন প্রণয়ন করা, যাতে এসব জাহাজে বহন করা তেলও বাজেয়াপ্ত করা যায়। এতে রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ তৈরি হবে।
তবে মস্কো এ ঘটনাকে ভিন্নভাবে দেখছে। ক্রেমলিনের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাজ্যের অভিবাসন সংকট থেকে জনমতকে সরিয়ে নিতে স্টারমার সরকার ট্যাঙ্কার আটকানোর ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটল, যখন সামরিক ব্যয় নিয়ে বিরোধের জেরে ব্রিটিশ রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলির পদত্যাগের পর ড্যান জারভিসকে নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন স্টারমার। দায়িত্ব নেওয়ার পরই জারভিস বলেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় রাশিয়া তার শ্যাডো ফ্লিটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই স্মির্টোসকে আটক করা পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ আঘাত।
বিশ্লেষকদের মতে, এ অভিযান কেবল একটি জাহাজ আটক করার ঘটনা নয়; বরং এটি রাশিয়ার জ্বালানি রফতানি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান কঠোর অবস্থানের প্রতীক। ইউক্রেন যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই রাশিয়ার অর্থায়নের উৎসগুলোকে লক্ষ্য করে এমন অভিযান বাড়তে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/জেডি