দুবাইয়ে গ্রেফতার হওয়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফেরত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘এনসিবি আবুধাবি’। আইন জটিলতা এড়াতে ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানাতে হবে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ। সেই অনুরোধপত্রের সঙ্গে আরবি ভাষায় দিতে হবে ৫ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নথি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের রেড নোটিস অনুযায়ী গত ১২ জুন দুবাইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন বেনজীর। লন্ডন থেকে এশিয়ার একটি দেশের উদ্দেশে যাত্রাকালে দুবাই ট্রানজিটে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর ‘এনসিবি আবুধাবি’ থেকে বাংলাদেশ পুলিশের ‘এনসিবি ঢাকা’ শাখায় এই সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতারের পর সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিচারিক কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করা হয়। এ সময় আদালত দেশটির ‘ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬’-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন।
দুবাই থেকে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের রেড নোটিস (নং- অ-৫১৭৪/৪-২০২৫) অনুযায়ী বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দেশটির প্রচলিত আইন অনুযায়ী, এই গ্রেফতারের পর ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক মাধ্যমের সাহায্যে লিখিতভাবে বাংলাদেশ সরকারকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ জমা দিতে হবে। অন্যথায় আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আরব আমিরাতের ফেডারেল আইন অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের জন্য মূল অনুরোধপত্রের সঙ্গে কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সম্পূর্ণ আরবি ভাষায় অনুবাদ করে, উপযুক্ত স্বাক্ষর ও সিলমোহরসহ জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় নথিগুলো হচ্ছে (১) অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম, বিস্তারিত বিবরণ, ছবি এবং তার জাতীয়তা ও আবাসনসংক্রান্ত তথ্য। (২) যে অপরাধের জন্য তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, বাংলাদেশের আইনে তার সুনির্দিষ্ট ধারা, সর্বোচ্চ শাস্তি এবং সীমাবদ্ধতার সংবিধির কপি। (৩) বাংলাদেশের বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক জারিকৃত আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা। (৪) মামলার ঘটনার বিবরণ, অপরাধের ধরন, সময় ও স্থান উল্লেখপূর্বক তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি। (৫) যদি ব্যক্তিটি ইতিমধ্যে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন, তবে আদালতের রায় এবং সাজা কার্যকরের আনুষ্ঠানিক অনুলিপি।
জানা গেছে, বেনজীরকে ফেরাতে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব তৈরি ও আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে এই প্রস্তাব দুবাইয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং সংশ্লিষ্ট দলিলাদি তৈরি করবে দুদক।
দুবাইয়ের আইন অনুযায়ী, গ্রেফতারের দিন থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠাতে হবে। বাংলাদেশের কাছ থেকে সব নথিপত্র পাওয়ার পর বেনজীরকে পাঠানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন আমিরাতের আদালত।
ইন্টারপোলের সঙ্গে সমন্বয়কারী এনসিবি শাখায় কাজের অভিজ্ঞতা আছে এমন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে তিনটি দেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে। দেশগুলো হলো ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। আরব আমিরাতের সঙ্গে এই ধরনের চুক্তি নেই। তবে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও আরব আমিরাত থেকে অতীতে বিভিন্ন সময় আসামি বা বন্দি ফিরিয়ে আনার একাধিক নজির বাংলাদেশের রয়েছে। মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) বা পারস্পরিক আইনি সহায়তার মাধ্যমে পলাতক অপরাধীকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
২০১৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ও আরব আমিরাতের মধ্যে তিনটি চুক্তি হয়। সেগুলো হলো নিরাপত্তা সহযোগিতা, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি স্থানান্তর এবং ঢাকায় আরব আমিরাতের দূতাবাসের জন্য জমি হস্তান্তরের চুক্তি।
গত রোববার জাতীয় সংসদে বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার প্রসঙ্গে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমিরাতের আইন অনুযায়ী কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে বেনজীরকে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা হবে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধীসহ একাধিক মামলা বিচারাধীন। তাকে ফেরত আনতে কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ করে দ্রুত বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে।
তিনি আরও বলেন, এটি বাংলাদেশ পুলিশের ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে আমরা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হব। পাশাপাশি জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এটি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত পুলিশের আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতারে ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার জন্য পুলিশ সদর দফতরের ন্যাশনাল সেন্টার ব্যুরোর পক্ষে আবেদন করা হয়। এ আবেদনটি ২০২৫ সালে পাঠানো হয়েছিল। ইন্টারপোল ২০২৫ রেড নোটিস জারি করে। ইন্টারপোল থেকে বেনজীরকে গ্রেফতারের জন্য আরব আমিরাতকে অনুরোধ করা হয়।
আরবিএন