পোলট্রি প্রকল্প নিয়ে ভয়াবহরকম স্বজন তোষণের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ’ ঘিরে নানা অনিয়ম, অর্থ ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতি ও গবেষণা কার্যক্রমে ব্যর্থতার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাত বছর মেয়াদি প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল দেশীয় পোলট্রি প্রজাতির উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং খামারিদের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পের অধিকাংশ অর্থ অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ব্যয় হলেও গবেষণার বাস্তব অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ। প্রকল্পটির পরিচালক ও বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সামনে আসায় সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের পোলট্রি খাতকে শক্তিশালী করা, পোলট্রি প্রজাতির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন, পোলট্রি খাদ্যের পুষ্টিমান নির্ধারণ, নিরাপদ মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি ও খামারিদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা। একই সঙ্গে গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক গবেষণাগার সরঞ্জাম ক্রয়, পোলট্রি শেড নির্মাণ ও মেরামত এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে পোলট্রি শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও এর মূল লক্ষ্য-গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন-বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় প্রধানত সৈয়দপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের কাজ সম্পন্ন হলেও প্রকল্পের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী পোলট্রি গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন কিংবা খামারিদের জন্য কার্যকর প্রযুক্তি হস্তান্তরের উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রমের দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, কৃষকদের কাছ থেকে কেনা জমির প্রকৃত মূল্যের তুলনায় সরকারি নথিতে বেশি মূল্য দেখানো হয়েছে। একই সঙ্গে একই স্থানে একবার মাটি ভরাট এবং পরে পুনরায় মাটি খনন করে পুকুর নির্মাণের নামে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
গবেষণার জন্য প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং গবেষণা-সহায়ক উপকরণের জন্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এ ছাড়া ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় প্রায় ২৫ কোটি টাকা। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রধান গবেষকরা নির্ধারিত বরাদ্দের একটি ক্ষুদ্র অংশও কার্যকরভাবে পাননি। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে প্রায় ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রশিক্ষণে প্রকল্প পরিচালকের স্ত্রী ড. ফারহানা শারমিনকে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং একাধিক সেশন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না হয়েও কীভাবে তিনি নিয়মিত প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। ফারহানা শারমিন বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পূর্বে প্রকল্পের বিভিন্ন দরপত্র ও কোটেশন কার্যক্রমের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ক্রয় ও সংশ্লিষ্ট তদারকি কার্যক্রমেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিভিন্ন অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হলেও সেগুলোর অনেকগুলো এখনও পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিজ্ঞানীদের মতে, পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে এসব যন্ত্রপাতির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।
এ ছাড়া বিভিন্ন দরপত্র, কোটেশন ও যন্ত্রপাতি ক্রয় কার্যক্রমে তার অনানুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। প্রকল্পে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপের জন্য প্রায় ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। অভিযোগ উঠেছে, এ অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকল্প পরিচালকের স্ত্রীর কাছে গেছে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিয়মিতভাবে মাস্টার রোলের আওতায় বেতন গ্রহণ করছেন। উদাহরণ হিসেবে তার শ্যালকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়া সত্ত্বেও মাস্টার রোলের মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গবেষণার উদ্দেশ্যে আফ্রিকা থেকে দুই দফায় ২২টি উটপাখি আনা হয়েছিল। বর্তমানে গবেষণা শেডে মাত্র চারটি উটপাখি রয়েছে এবং এ গবেষণা থেকে কোনো কার্যকর প্রযুক্তি বা নতুন জাত উদ্ভাবনের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ১,২০০টি কোয়েল পাখি সৈয়দপুর কেন্দ্রে স্থানান্তরের পর সেগুলোর মৃত্যুর তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি এবং পরে আরও ১,০০০টি কোয়েল স্থানান্তর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ড. সাজেদুল করিম সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সমর্থন প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড প্রচার এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসাসূচক ভাষায় উল্লেখ করার বিষয়টি নিয়ে সহকর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। একাধিক ক্ষেত্রে তাকে ‘এশিয়ার আয়রন লেডি’ বলে উল্লেখ করতে দেখা গেছে, যা সমালোচকদের মতে সরকারের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং প্রকাশ্য সমর্থনের কারণেই তিনি ১৩৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
অন্যদিকে গত ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন আসার পর ড. সাজেদুল করিম সরকারের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার ভূমিকা, অন্তর্বর্তী সময়ে তার অবস্থান এবং বর্তমান সরকারের প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান এসব বিষয় নিয়ে তার সহকর্মীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠছে।
তবে সব অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করেন প্রকল্প পরিচালক ও বিএলআরআইয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজেদুল করিম। সময়ের আলোকে তিনি বলেন, উদ্দেশ্যমূলকভাবে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
আরবিএন