পারস্য উপসাগরের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে এবার মাঝসমুদ্রে এক নজিরবিহীন ও গোপন তেল পারাপার অভিযানে নেমেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরানের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আর আকাশপথের পাহারাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সচল রাখতে ওয়াশিংটন এই কৌশল বেছে নিয়েছে। ড্রোন ও হেলিকপ্টারের কড়া নজরদারিতে ওমান উপসাগরের বুক চিরে রাতারাতি বসানো হয়েছে এক ‘ভুতুড়ে’ তেলের হাট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অতি-গোপন মিশনের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য সম্প্রতি ফাঁস করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
কূটনৈতিক মহলের মতে, ইরান যেভাবে এতদিন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে মাঝসমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের গোপন চতুরতা অবলম্বন করত, এবার তেহরানকে রুখতে মার্কিন প্রশাসন নিজেই সেই একই পুরোনো চাল চালতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত ছবি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মে মাসের শুরু থেকে এই বিশেষ মার্কিন অপারেশনটি শুরু হয়। ইতিমধ্যেই অন্তত ৯২টি বিশাল আকৃতির জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ এই গোপন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। ওমান উপসাগরের দুটি সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা চলছে এই তেল খালাসের মহাযজ্ঞ। এর একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজিরাহ উপকূল এবং অন্যটি ওমানের সোর্হার বন্দর সংলগ্ন গভীর সমুদ্র। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, প্রায়ই এই দুই পয়েন্টে ১৭ জোড়া বিশাল ট্যাঙ্কার পাশাপাশি অবস্থান করে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল পাম্প করছে।
এই অভিযানের ঝুঁকি ও তীব্রতা কতটা ভয়াবহ, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে গত ৯ জুনের এক রক্তক্ষয়ী ঘটনায়। ওই দিন ওমান উপকূলের আকাশ থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি শক্তিশালী অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে ইরান। এর জবাবে মার্কিন বাহিনীও পাল্টা বোমাবর্ষণ শুরু করে। একাধিক নির্ভরযোগ্য সামরিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ভূপাতিত অ্যাপাচি বিমানটি মূলত এই তেল স্থানান্তর প্রক্রিয়ার পাহারায় নিয়োজিত ছিল। যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম এই অভিযানের কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে, তবে তারা স্বীকার করেছে যে ওমানে বিধ্বস্ত হওয়া অ্যাপাচির দুই ক্রু মেম্বারকে একটি ড্রোন বোটের সাহায্যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় মার্কিন বাহিনী অত্যন্ত চতুর সামরিক কায়দায় এই অপারেশন পরিচালনা করছে। হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশের আগেই তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে জড়ো করা হয়। এরপর কয়েক কিলোমিটারের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে একে একে জাহাজগুলো রওনা দেয়। সনাক্তকরণ এড়াতে জাহাজের সব বাতি নিভিয়ে রাখা হয় এবং জিপিএস ট্র্যাকিং বা ট্রান্সপন্ডার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। মূলত বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ অফিস থেকে পুরো রুটটি সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। কঠোর স্ক্রিনিং এবং ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই কেবল কোনো জাহাজকে এই গোপন রুটে ট্রানজিট দেওয়া হচ্ছে।
এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, একসময় চীন, রাশিয়া বা ইরান মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে যেভাবে ট্র্যাকিং বন্ধ করে ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা ভুতুড়ে জাহাজের সাহায্য নিত, আজ বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সচল রাখতে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই ঠিক সেই অভিন্ন পথ বেছে নিতে হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম সংকটের মধ্যেও যে কটি দেশ জীবন বাজি রেখে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পাঠাতে রাজি হচ্ছে, তাদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আদনক এবং কুয়েত অয়েল ট্যাঙ্কার কোম্পানি অন্যতম। মে মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯০ মিলিয়ন বা ৯ কোটি ব্যারেল তেল এই গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে।
পাশাপাশি গ্রিসের বিখ্যাত ডাইনাকম ট্যাঙ্কার্সের মতো আন্তর্জাতিক শিপিং অপারেটররাও এই অভিযানে শামিল হয়েছে। গ্রিক শিপিং সংস্থাগুলোর দাবি, সমুদ্রে চলাচলের স্বাধীনতা সবার আন্তর্জাতিক অধিকার এবং প্রাচীনকাল থেকেই গ্রিসের জাহাজ অবরোধ ভাঙার ইতিহাস গড়ে এসেছে।
/কহু