সাম্বা, ফুটবল ও প্রাণবন্ত সংস্কৃতির দেশ হিসেবে পরিচিত ব্রাজিলের তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ বর্তমানে মানসিক হতাশা ও মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, দেশটির তরুণদের মধ্যে অ্যালকোহল ও অবৈধ মাদক, বিশেষ করে গাঁজা ব্যবহারের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষকদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং মাদকের সহজলভ্যতা এ প্রবণতার প্রধান কারণ।
১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে অ্যালকোহল সেবন করেছেন। প্রায় ৩০ শতাংশ অন্তত একবার অবৈধ মাদক ব্যবহার করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা, যার হার ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া প্রায় ১০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী কোকেন ব্যবহার করেছেন।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, গত এক বছরে ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ তরুণ অ্যালকোহল সেবন করেছেন। একই সময়ে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ গাঁজা, ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কোকেন এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ অন্যান্য মাদক ব্যবহার করেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিলে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত মানসিক সমস্যার হার সবচেয়ে বেশি। গত মার্চে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশটিতে বিষণ্নতা নিরাময়ের ওষুধ ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারের প্রবণতা প্রায় ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যের কারণে অনেক তরুণ প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক ক্যানাবিস বিজনেস কনফারেন্সের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের প্রায় ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক জীবনে অন্তত একবার গাঁজা ব্যবহার করেছেন। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় এক কোটি মানুষ নিয়মিত গাঁজা সেবন করেন, যাদের বড় অংশ তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাঁজার সহজলভ্যতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ আইনি শিথিলতা। ২০২৪ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সীমিত পরিমাণ গাঁজা রাখাকে ফৌজদারি অপরাধের আওতার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত দেয়। এরপর থেকে মাদকটি তরুণদের কাছে আরও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।
ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলোর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৪ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রতি সাতজন ব্রাজিলিয়ানের মধ্যে একজন অন্তত একবার গাঁজা ব্যবহার করেছেন। ২০২৩ সালে প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ নিয়মিত গাঁজা ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন।
১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এ বয়সী ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ তরুণ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে গাঁজা সেবন করেছেন এবং ১৩ দশমিক ২ শতাংশ নিয়মিত ব্যবহারকারী।
গবেষকদের মতে, একাকিত্ব, হতাশা ও মানসিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে অনেক তরুণ গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এসব মাদক তাদের মানসিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, হতাশা ও গাঁজা ব্যবহারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অনেক তরুণ মানসিক কষ্ট কমানোর আশায় গাঁজা সেবন শুরু করলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আরও বেড়ে যেতে পারে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কৈশোরে গাঁজা ব্যবহার শুরু করলে পরবর্তী জীবনে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সাইকোটিক ডিসঅর্ডার এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সে গাঁজা ব্যবহারকারীদের মধ্যে গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।
ব্রাজিলিয়ান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক তরুণ মানসিক কষ্ট থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মাদককে বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু এটি শেষ পর্যন্ত তাদের আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রদর্শিত অবাস্তব জীবনধারার চাপ তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব ও হতাশা বাড়িয়ে তুলছে। এর ফলে মাদকাসক্তির ঝুঁকিও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আরবিএন