ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়ার বয়স ৯৩ বছর। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই প্রবীণ নেতা এখন টানা দুই মাস ধরে দেশের বাইরে। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ‘ব্যক্তিগত সফরে’ ইউরোপে গেছেন। কিন্তু দীর্ঘ এই অনুপস্থিতি ঘিরে তার শারীরিক সক্ষমতা, রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা এবং ক্যামেরুনের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক রাষ্ট্রপ্রধান পল বিয়া গত ৭ জুন ক্যামেরুন ছাড়েন। সরকারের পক্ষ থেকে শুরুতে জানানো হয়েছিল, এটি একটি সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত সফর। কিন্তু দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি দেশে ফেরেননি। তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
ক্যামেরুন সরকারের মুখপাত্র রেনে ইমানুয়েল সাদি সম্প্রতি ফরাসি রেডিও আরএফআইকে জানান, পল বিয়া বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থান করছেন। তিনি হাসপাতালে ভর্তি নন এবং সুস্থ আছেন বলেও দাবি করেন সাদি। তবে প্রেসিডেন্টের শারীরিক অবস্থা বা দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
পল বিয়ার দীর্ঘ অনুপস্থিতি অবশ্য ক্যামেরুনের রাজনীতিতে একেবারে নতুন ঘটনা নয়। জনসমক্ষে তাকে খুব কমই দেখা যায়। বছরের বড় একটি সময় দেশের বাইরে থাকা কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে আড়ালে থাকাও তার পুরোনো অভ্যাস। তবে এবারের অনুপস্থিতির সময়কাল সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ হওয়ায় তার স্বাস্থ্য ও দেশ পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
তার স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা গুঞ্জন রয়েছে। তবে ক্যামেরুন সরকার বরাবরই এসব খবর অস্বীকার করে এসেছে। এমনকি ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা নিষিদ্ধ করে সরকার। বিষয়টিকে তখন ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
পল বিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্যামেরুনের কয়েক প্রজন্মের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। ১৯৮৪ সালে তিনি যখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথমবার নির্বাচনে জয়ী হন, তখন এনফর্মি বিমে ছিলেন মাত্র ২৩ বছরের এক তরুণ ছাত্র। বর্তমানে বিমের বয়স ৬৫ বছর এবং তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। অথচ পল বিয়া এখনো দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায়।
গত বছর বিতর্কিত এক নির্বাচনে জয়ী হয়ে অষ্টম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বিয়া। বিরোধীরা ওই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। নতুন মেয়াদ শেষ হলে তার বয়স ১০০ বছরের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পর ক্যামেরুনের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট পল বিয়া। ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আহমাদু আহিদজোর পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন তিনি। এরপর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটির শীর্ষ পদে রয়েছেন।
আফ্রিকার রাজনীতিতে পল বিয়ার দীর্ঘ শাসন একটি বড় বৈপরীত্যের প্রতীক। বিশ্বের সবচেয়ে তরুণ জনসংখ্যার অন্যতম এই মহাদেশের অনেক দেশই এখনো শাসিত হচ্ছে এমন নেতাদের হাতে, যাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল কয়েক দশক আগে।
ক্যামেরুনের বহু মানুষের জীবনে পল বিয়াই একমাত্র প্রেসিডেন্ট। এনফর্মি বিমের সন্তানদের বড়টির বয়স ৩২ বছর, ছোটটির ১৮। তাদের পুরো জীবনেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তারা দেখে এসেছেন পল বিয়াকে।
ইয়াউন্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬ বছর বয়সী ডক্টরাল শিক্ষার্থী আবিদ রিয়াসাই আচাওও একই প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাদের কাছে পল বিয়া শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নন; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক।
তাই ৯৩ বছর বয়সী প্রেসিডেন্টের এবারের দীর্ঘ অনুপস্থিতি শুধু তার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না, বরং ক্যামেরুনে তার পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায় কেমন হবে, সেই প্রশ্নও সামনে আনছে। দীর্ঘদিনের এই শাসকের অনুপস্থিতি দেশটির রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
সময়ের আলো/এসএকে