অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে নির্বাসন চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে এ ধরনের নির্বাসন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নিম্ন আদালতের একটি রায় স্থগিত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি আবেদন মঞ্জুর করে এ অনুমতি দেয়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর ফলে এমন দেশেও অভিবাসীদের পাঠানো যাবে, যেসব দেশের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নাও থাকতে পারে।
নিম্ন আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর আগে অভিবাসীদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বা আপত্তি জানানোর ‘অর্থবহ’ সুযোগ দিতে হবে। আদালতের বিচারক ব্রায়ান মারফি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, কিছু অভিবাসীকে নির্বাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়নি। এতে তাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার বা ‘ডিউ প্রসেস’ লঙ্ঘিত হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সুপ্রিম কোর্টের মঙ্গলবারের আদেশে কোনো বিচারপতির স্বাক্ষর ছিল না। সাধারণত জরুরি আবেদনের ক্ষেত্রে স্বাক্ষর থাকলেও এবার আদেশে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। কোন বিচারপতি কীভাবে ভোট দিয়েছেন, সেই তালিকাও প্রকাশ করা হয়নি। তবে তিন উদারপন্থী বিচারপতি- সোনিয়া সোটোমেয়র, কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন ও এলেনা কাগান জানিয়েছেন, তারা ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করতেন।
আদালতের আদেশে নিম্ন আদালতের রায় সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তিতর্ক বা শুনানি হবে আগামী ডিসেম্বর মাসে। এ সময় ট্রাম্প প্রশাসন বোস্টনের বিচারক মারফির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল চালিয়ে যাবে।
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর ২০২৫ সালে তৃতীয় দেশে অভিবাসী নির্বাসনের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। তার প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি, নিজ নিজ দেশ নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানালে তৃতীয় দেশে পাঠানো তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি উপায়।
২০২৫ সালের জুনেও সুপ্রিম কোর্ট একটি স্বাক্ষরবিহীন আদেশে এ ধরনের নির্বাসন চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। এর ফলে ৮ জন পুরুষকে দক্ষিণ সুদানে পাঠানোর পথ খুলে যায়। তাদের মধ্যে কিউবা, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের নাগরিক ছিলেন। তবে দক্ষিণ সুদানে ভ্রমণের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, দেশটিতে অপরাধ, অপহরণ ও সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে।
ওই সময় মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এসব নির্বাসনকে ‘বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে, এতে মৌলিক আইনি সুরক্ষা উপেক্ষা করা হয়েছে। সমালোচকেরা আরও বলেন, তৃতীয় দেশ হিসেবে নির্বাসিত ব্যক্তিদের গ্রহণ করা অনেক দেশেরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড রয়েছে।
নিজ দেশে ফেরত পাঠালে নির্যাতন বা নিপীড়নের আশঙ্কা থাকায় আদালতের সুরক্ষা পাওয়া অভিবাসীদের ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশে নির্বাসনের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের দাবি, তৃতীয় দেশ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া কিছু দেশ পরে এসব ব্যক্তিকে আবার এমন দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে, যেখানে তারা নির্যাতন বা অন্য ধরনের ক্ষতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন।
রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ফার্স্টের হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৩৫টি দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এমন চুক্তি করেছে, যার আওতায় তারা তৃতীয় দেশের নাগরিকদের গ্রহণ করবে। দুই সংগঠনের দাবি, এখন পর্যন্ত ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে তৃতীয় কোনো দেশে নির্বাসনের আওতায় আনা হয়েছে।
সোমবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা মার্কিন সরকারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ ধরনের নির্বাসন বন্ধের আহ্বান জানান। তাদের সতর্কবার্তা, এসব নির্বাসনের কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নির্যাতন ও নিপীড়নের আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মানবপাচারের শিকার, এলজিবিটি ব্যক্তি, মানবাধিকারকর্মী, রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা অন্যদের ঝুঁকি বেশি বলে উল্লেখ করেন তারা।
এদিকে মঙ্গলবার বুরুন্ডি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তিতে যাওয়া সর্বশেষ দেশ হয়েছে। চুক্তির আওতায় দেশটি নিজেদের নাগরিক নয়- এমন নির্বাসিত ব্যক্তিদের গ্রহণ করবে। তবে বুরুন্ডির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা ফৌজদারি বিচার চলছে না এবং ‘সন্ত্রাসবাদের’ সঙ্গে যাদের কোনো সম্পর্ক নেই, শুধু তাদেরই গ্রহণ করা হবে।
সময়ের আলো/মহু