একটি অস্ত্রকে বলা হচ্ছে ‘নন-লেথাল’–অর্থাৎ প্রাণঘাতী নয়। কিন্তু সেই অস্ত্রেই কেউ হারাচ্ছেন দৃষ্টিশক্তি, কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গু হচ্ছেন, আবার কারও মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে। ভারতের কাশ্মীর থেকে দিল্লি, দিল্লি থেকে ঢাকা, ফিলিস্তিন থেকে চিলি-জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে পেলেট গান ব্যবহারের ইতিহাস এখন সেই প্রশ্নই সামনে আনছে : যে অস্ত্রকে কম প্রাণঘাতী বলা হয়, সেটি আসলে কতটা নিরাপদ?
২০২৬ সালের জুলাইয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়টি উঠে আসে। সংস্থাটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ভারত থেকে ইসরায়েলে যাওয়া ২ হাজার ৫৯৬টি অস্ত্র, গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও সামরিক সরঞ্জামের চালান বিশ্লেষণ করেছে। এসবের মধ্যে মেশিনগানের যন্ত্রাংশ, ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলার উপাদান, ড্রোনের ওয়ারহেড এবং সাঁজোয়া যানবাহনের অংশও ছিল।
তবে অস্ত্রের এই আন্তর্জাতিক সরবরাহের চেয়েও বড় প্রশ্ন হতে পারে আরেকটি-এক দেশে কোনো অস্ত্রের ব্যবহার যখন স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়, তখন তার ব্যবহার অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
কাশ্মীর থেকে দিল্লি
ভারতে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে পেলেট গানের ব্যবহার শুরু হয় কাশ্মীরে। ২০১০ সাল থেকে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনী ধাতব পেলেট ছোড়ার শটগান ব্যবহার করে আসছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, এসব অস্ত্রের ব্যবহারে ২০১৬ সালের পর অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন এবং এক হাজারের বেশি মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে কেবল শ্রীনগরের একটি হাসপাতালে পেলেটজনিত চোখের আঘাতে ১ হাজার ২৫৩ জনের চিকিৎসা নেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়।
পেলেট গান সাধারণত একটি শটগান, যার একটি কার্তুজে থাকে শত শত ছোট ধাতব পেলেট। গুলি ছোড়ার পর সেগুলো একটি বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একটি গুলিতে একাধিক মানুষ আহত হতে পারেন এবং অস্ত্রটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ব্যবহার করা কঠিন।
এই বৈশিষ্ট্যই পেলেট গানকে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিতর্কিত করে তুলেছে। কাশ্মীরে এর ব্যবহারে চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাতের বহু ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে ‘কম প্রাণঘাতী’ শব্দটি অস্ত্রটির বাস্তব ক্ষতির মাত্রা বোঝাতে কতটা যথাযথ-সেই প্রশ্নও উঠেছে।
সেই একই অস্ত্র পরে ভারতের অন্য অঞ্চলেও ব্যবহৃত হয়েছে। কৃষক আন্দোলন ও মণিপুরের বিক্ষোভের পর দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনেও পেলেট ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে। ফলে কাশ্মীরের জন্য তৈরি করা নিরাপত্তা কৌশল ধীরে ধীরে দেশের অন্য অংশেও পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগ উঠছে।
‘তারা শিক্ষার্থী, সন্ত্রাসী নয়’
দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের ওপর পেলেট ব্যবহারের ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। কিন্তু এ নিয়ে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা আরও গভীর-একই অস্ত্রের ব্যবহার কেন এক জায়গায় তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়, আর অন্য জায়গায় দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হয়?
কাশ্মীর, মণিপুর কিংবা কৃষক আন্দোলনের ক্ষেত্রে আন্দোলনকারীদের পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অস্ত্র ব্যবহারের যৌক্তিকতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে–এমন অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এতে জননিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নটি অনেক সময় পরিচয় ও নিরাপত্তা-রাজনীতির আড়ালে চলে যায়।
সীমান্ত পেরিয়ে একই অস্ত্র
পেলেট বা এ ধরনের কাইনেটিক ইমপ্যাক্ট প্রজেক্টাইলের ব্যবহার অবশ্য ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের ‘দ্য ট্রাবলস’ চলাকালে ব্রিটিশ নিরাপত্তা বাহিনী রাবার ও প্লাস্টিকের প্রজেক্টাইল ব্যবহার করেছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশও জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে।
চিলির ২০১৯ সালের বিক্ষোভে পেলেট ব্যবহারের পর শত শত মানুষ চোখে গুরুতর আঘাত পান। দেশটির মানবাধিকার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় ২৩০-এর বেশি মানুষের চোখে আঘাতের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল; মানবাধিকার সংস্থাগুলো পেলেটকে এসব আঘাতের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে।
বাংলাদেশেও ২০২৪ সালের আন্দোলনে পেলেট ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে। ‘Lethal in Disguise’ প্রকল্পের একটি কেস স্টাডিতে বলা হয়েছে, ১৭ জুলাই থেকে ২৭ আগস্টের মধ্যে অন্তত ২২ শিক্ষার্থী পেলেটের আঘাতে নিহত এবং আরও ৪০০ জন দৃষ্টিশক্তি হারান।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকার রায়েরবাজারে পুলিশের ছোড়া শটগানের পেলেটে গুরুতর আহত হন ১৯ বছর বয়সী মো. বাপ্পী হোসেন। তার দুই চোখে পাঁচটি পেলেট ঢুকে যায়–বাঁ চোখে তিনটি ও ডান চোখে দুটি। তিন দফা অস্ত্রোপচারের পরও তিনি দুই চোখে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাননি। তার মা জানান, বাপ্পীর শরীরে আরও ১৯টি শটগানের পেলেট রয়ে গেছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের (OHCHR) তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট চোখের আঘাত নিয়ে ৭৩৬ জন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৫০৪ জনের জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়েছিল।
‘প্রাণঘাতী নয়’ শব্দটির আড়ালে
পেলেট গান নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে তাই শুধু অস্ত্রটি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত ভাষাটিও। ‘নন-লেথাল’ বা ‘লেস-লেথাল’ শব্দটি অনেক সময় এমন একটি ধারণা তৈরি করে যে এসব অস্ত্র প্রাণহানির ঝুঁকি কমায়। কিন্তু বাস্তবে ব্যবহারের ধরন, দূরত্ব, লক্ষ্যবস্তু এবং গুলির গতিপথের ওপর নির্ভর করে এগুলো গুরুতর বা স্থায়ী আঘাত এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক এক প্রতিবেদনে চিলিতে ব্যবহৃত পেলেটের ক্ষেত্রে ত্বক ভেদ করে শরীরে ঢুকে যাওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, চোখ ও মুখে বিপুলসংখ্যক আঘাতের ঘটনা অস্ত্রটির ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
আর এখানেই বিষয়টি শুধু একটি দেশের পুলিশি কৌশল বা একটি নির্দিষ্ট সংঘাতের ইতিহাসে আটকে থাকে না। কোনো রাষ্ট্র যখন একটি বিতর্কিত অস্ত্রকে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণের গ্রহণযোগ্য উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, অন্য রাষ্ট্রগুলোও সেটিকে একই ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যবহারের নজির হিসেবে দেখতে পারে।
অস্ত্রের বিস্তার তাই শুধু কার কাছে কতগুলো বন্দুক বা গোলাবারুদ গেল-সেই হিসাব নয়। এর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে ব্যবহার করার পদ্ধতি, যুক্তি এবং দায় এড়ানোর ভাষাও।
কাশ্মীর থেকে দিল্লি, ফিলিস্তিন থেকে চিলি-পেলেট গানের ইতিহাস সেই বাস্তবতাই সামনে আনে। একটি জায়গায় যে অস্ত্রকে ‘কম প্রাণঘাতী’ বলা হয়, অন্য জায়গায় সেটিই হয়ে উঠতে পারে স্থায়ী অন্ধত্ব, গুরুতর শারীরিক ক্ষতি কিংবা মৃত্যুর কারণ। প্রশ্নটি তাই শুধু অস্ত্রটি কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে, তা নয়; বরং কোন যুক্তিতে বেসামরিক মানুষের ওপর এর ব্যবহার গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
সূত্র : মিডিল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত অনুরাধা ভাসিনের কলাম থেকে
সময়ের আলো/জেডি