বিএনপির কাঁটা ‘বিদ্রোহী’

সাব্বির আহমেদ

রাজনীতি

নিজেদের অবস্থান জানান দিতে সবশেষ কুরবানির ঈদে প্রায় প্রতিটি এলাকায় মোটর শোডাউন করেছেন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

2026-06-17T00:44:52+00:00
2026-06-17T00:44:52+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
রাজনীতি
বিএনপির কাঁটা ‘বিদ্রোহী’
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১২:৪৪ এএম   (ভিজিট : ৯)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
নিজেদের অবস্থান জানান দিতে সবশেষ কুরবানির ঈদে প্রায় প্রতিটি এলাকায় মোটর শোডাউন করেছেন আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কেউ ইউনিয়ন পরিষদ, কেউ পৌরসভা, কেউ বা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। 

তবে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে বেশি সরব। চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে। স্থানীয় সরকারের এসব নির্বাচনে সরকার দল বিএনপির জন্য বড় কাঁটা হবে বিদ্রোহী প্রার্থী ও মৌসুমি প্রতিযোগী। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে সরকারি দলকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। তার মধ্যে সবচেয়ে জরুরি একক প্রার্থী নিশ্চিত করা, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থী দমন।

বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কিছু জায়গায় দলীয় প্রার্থীও ঘোষণা করেছে। 

বিশেষ করে চলতি বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। যেসব ইউনিয়ন পরিষদ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়েছে, সেগুলোতে আগে নির্বাচন হবে। এরপর হবে পৌরসভা নির্বাচন। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকারের ভোট শুরু হতে পারে। তবে দলীয় প্রতীক না থাকায় সম্ভাব্য ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও নিজেদের মধ্যে কলহ বাড়ার আশঙ্কা বাড়ছে বিএনপির ভেতরে।

সবশেষ ঈদে তারই আভাস মিলেছে। গাজীপুরের কাপাসিয়ার ১১টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে দুই বা ততধিক বিএনপির প্রার্থী সক্রিয় আছেন। সবাই চেয়ারম্যান প্রার্থী। আর মেম্বার প্রার্থীর তো হিসেবই নেই। সবাই বিএনপির ব্যানারে প্রচারণা চালাচ্ছেন নিজ নিজ এলাকায়। 

বিপরীতে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামির প্রার্থী প্রত্যেক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে একজন। তারা নিজেদের কেন্দ্র থেকে মনোনীত বলে প্রচার করছে। তাদের জন্য জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। কিছু জায়গায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা মাঠে সরব হচ্ছেন। ঈদে বিএনপি প্রার্থীরা গ্রামেগঞ্জে হাটবাজারে মোটর সাইকেল শোডাউন করেছেন। পোস্টার ফেস্টুনে গোটা এলাকা ছেয়ে ফেলেছেন। সামাজিক মাধ্যমেও সোচ্চার তারা। বর্তমানে এই প্রার্থীদের কেউ ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে তরুণদের নিয়ে শোডাউন করছেন। প্রার্থীদের কেউ কেউ খেলা দেখাতে ডিজিটাল মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করেছেন। 

বিএনপি এবং জামায়াত ছাড়াও আওয়ামী লীগের কিছু প্রার্থীও অনলাইন মাধ্যমে সরব হয়েছেন। তারা স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। তবে তারা নিজেদের দলীয় পরিচয়কে সামনে আনছেন না। তারা ব্যানার ফেস্টুনে বিভিন্ন সামজিক সংগঠনের পরিচয় ব্যবহার করছেন। মাঠে নেমে কিছু প্রার্থী বিএনপির আক্রমণের শিকারও হচ্ছেন। কাপাসিয়ার টোক ইউনিয়নের তিনবারের মেম্বার শফিকুল ইসলাম কবির। এবার তিনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। আওয়ামী লীগ সমর্থিত এই প্রার্থী নিজে সক্রিয়ভাবে মাঠে নাম নামতে না পারলেও তার পক্ষে কাজ করছে একটি বড় গ্রুপ। পক্ষান্তরে বিএনপির আবু বক্কর সিদ্দিক কিরণ, ইমরান হোসেন ও আবেদ মিয়াসহ কয়েকজন প্রার্থী মাঠে সক্রিয়।

আরও অনেক এলাকায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে যেসব এলাকায় বিএনপির বিদ্রোহী এমপি প্রার্থী ছিলেন; সেগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। বিদ্রোহী প্রার্থীর অনুসারিরা স্থানীয় নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় আছেন। আর এমপির সমর্থিতরাও এলাকায় সরব। আর যেসব এলাকায় বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এমপি হয়েছেন; সেসব এলাকায় অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও কলহও বাড়াছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে চেইন অব কমান্ড নেই। সবাই বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে অনানুষ্ঠানিক গণসংযোগ করছেন। নিজ এলাকায় বিভিন্ন উপলক্ষ ঘিরে পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার টানাচ্ছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তারা প্রার্থিতার ঘোষণা দিচ্ছেন।

গত ৯ মে রাজধানীর খামারবাড়ীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে বিএনপি ও এর তিন সহযোগী সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বড় পরিসরে এটি ছিল বিএনপির প্রথম সাংগঠনিক মতবিনিময় সভা। ওইদিন তিনি নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকা, ভালো আচরণের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করা এবং মাঠে কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জনের পরামর্শ দেন। 

সাফ জানিয়ে দেন, দলীয় সুবিধা দিয়ে কাউকে জিতিয়ে আনার সুযোগ নেই। কাজ করেই নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আমলনামা ভারি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন দলীয় প্রধান।

বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, দলের চেয়ারম্যান আমাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে। নিজ যোগ্যতায় জিতে আসতে হবে। কাউকে জিতিয়ে আনার দায়িত্ব দল ও সরকার নেবে না। 

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তার মা-বাবার জানাজায় বিপুল উপস্থিতি ও তাদের ভালোবাসার কথা উল্লেখ করেছেন। এই নির্বাচনে জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিতে হবে। এ জন্য জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করতে হবে। কারও কর্মকাণ্ডে যাতে দল ও সরকার বিব্রত না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপের ঘোষণা না হলেও, প্রার্থী বাছাই নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরে। নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায়, প্রার্থী চূড়ান্তে ঠিক করা হয়েছে তিনটি মানদণ্ড। পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনে মতো স্থানীয় পর্যায়েও জোটবদ্ধ ভোট করার চিন্তা করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। আর সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অযাচিত হস্তক্ষেপের বিষয়ে দলীয় সাংগঠনিক সভায় সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 
তিনি বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক।

স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে দলের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর পূর্ণ শক্তি নিয়ে নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে নামবেন। সরকারের অর্জনগুলো জনমনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে দাবি করে নির্বাচনে দলীয় নেতাদের জয়ের ব্যাপারেও আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে শুধু দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর পারিবারিক ঐতিহ্য, জনসেবা, ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। স্থানীয় নির্বাচনে উপযুক্ত প্রার্থী নির্ধারণ ও স্থানীয় বিরোধ মেটাতে পারলে বিএনপি স্থানীয় নির্বাচনে অত্যন্ত শক্তিশালী ফল অর্জন করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

স্থানীয় নির্বাচনে শক্তিশালী ফল অর্জনের জন্য বিএনপিকে মূলত তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান। 

সময়ের আলোকে তিনি বলেন, একক প্রার্থী নিশ্চিত করা, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহী প্রার্থী দমন এবং সরকার পরিচালনার পাশাপাশি তৃণমূলের সংগঠন সক্রিয় রাখায় গুরুত্ব দিতে হবে সরকারি দলকে। স্থানীয় নির্বাচনে প্রতীক না থাকায় দলীয় প্রার্থীর চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, পারিবারিক ঐতিহ্য ও জনসেবা বেশি প্রাধান্য পায়। অনেক সময় দলের জনপ্রিয়তার চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা বেশি থাকে। 

বিএনপিকে প্রতিটি এলাকায় জরিপ ও স্থানীয় মূল্যায়নের মাধ্যমে শুধু একজন একক প্রার্থী বাছাই করতে হবে। একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলে বিরোধী পক্ষ বা অন্য জোটের প্রার্থীরা সুবিধা পেয়ে যেতে পারেন। দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি না থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীরা নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে সাবেক সংসদ সদস্য বা প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় কর্মী-সমর্থকদের বিরোধ দেখা যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক সময়ের আলোকে বলেন, সরকারি দলে সুবিধাভোগী ও অংশীজনের ভিড় বেশি থাকে। সে জন্য দলের মধ্যে প্রতিযোগী বেশি দেখা যায়। এতে ভোট ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। স্থানীয় নির্বাচনে এসব কারণে বিরোধী দল সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে। আমি মনে করি সরকারি দলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো।

/এসএকে


  বিষয়:   বিএনপি  কাঁটা  বিদ্রোহী  রাজনীতি  নির্বাচন 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: