সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। পৃথিবীর সব সম্পদ হারিয়ে গেলে তা পুনরায় অর্জন করা সম্ভব হতে পারে কিন্তু একবার চলে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে আসে না। তাই ইসলাম সময়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারকে মুমিনের সফলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সময়ের শপথ করে বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত’ (সুরা আসর, আয়াত : ১-২)। এই সময়কে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য ইসলাম একটি স্বতন্ত্র সময়ব্যবস্থা প্রদান করেছে, যা হিজরি সন নামে পরিচিত। হিজরি সন শুধু একটি বর্ষপঞ্জি নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার এক জীবন্ত স্মারক।
হিজরি সনের ঐতিহাসিক পটভূমিহিজরি সনের সূচনা ইসলামের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা কেন্দ্র করে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এই হিজরতের মাধ্যমে নির্যাতিত মুসলমানরা একটি স্বাধীন পরিবেশে ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ লাভ করেন। ইতিহাসবিদ ইমাম তাবারী (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খেলাফতকালে প্রশাসনিক প্রয়োজনে একটি ইসলামি বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে হিজরতকে ইসলামি সনের সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করা হয় (তারিখে তাবারি : ২/৩৮৯)। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বর্ণনা করেন যে, হজরত আলি (রা.)-এর পরামর্শেই মহানবী (সা.)-এর হিজরতকে ইসলামি সনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয় (আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ : ৩/২৫১)। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, হিজরতকে ইসলামি সনের ভিত্তি করা হয়েছে কারণ এর মাধ্যমেই ইসলামি রাষ্ট্র ও সভ্যতার বাস্তব সূচনা ঘটে। (ফাতহুল বারী : ৭/২৬৮)
আরও পড়ুন
কুরআনের আলোকে হিজরি সনের গুরুত্বপবিত্র কুরআনে চান্দ্র মাস ও সময় গণনার গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, তা মানুষের এবং হজের সময় নির্ধারণের মাধ্যম’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৯)। এই আয়াত প্রমাণ করে যে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলো চান্দ্রমাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি’ (সূরা তাওবা, আয়াত : ৩৬)। এই আয়াত মুসলিম উম্মাহকে একটি নির্দিষ্ট সময় কাঠামোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং ইসলামি বর্ষপঞ্জির গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছে, তারাই আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২১৮)। এ আয়াত হিজরতের মর্যাদা এবং এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তুলে ধরে।
হিজরি সন ও ইসলামি ইবাদতহিজরি সন ইসলামি জীবনব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। মুসলমানদের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এই সনের ওপর নির্ভরশীল। রমজানের রোজা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, হজ, আশুরার রোজা, আরাফার দিবস, জাকাতের হিসাব এবং ইদ্দতের সময়কাল- সবই হিজরি মাস ও বছরের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের রোজা চাঁদ দেখে শুরু করো এবং চাঁদ দেখে শেষ করো’ (বুখারি, হাদিস : ১৯০৯)। এ হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ইসলামের সময়ব্যবস্থা চান্দ্র বর্ষপঞ্জির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
মুসলিম আত্মপরিচয়ের প্রতীকপ্রতিটি জাতির নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রতীক রয়েছে। মুসলিম উম্মাহর জন্য হিজরি সন তেমনই একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ের বাহক। আজকের বিশ্বায়নের যুগে অনেক মুসলমান ইংরেজি মাস ও সাল সম্পর্কে সচেতন হলেও হিজরি মাসগুলোর নাম ও গুরুত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ। এটি মুসলিম ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্নতার একটি লক্ষণ। হিজরি সন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- আমরা একটি বিশ্বজনীন মুসলিম উম্মাহর অংশ। আমাদের ইতিহাস ত্যাগ, কুরবানি ও সংগ্রামের ইতিহাস।
আমাদের সভ্যতার ভিত্তি কুরআন ও সুন্নাহ। আমাদের আদর্শ মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম। অতএব হিজরি সনের চর্চা মুসলিম পরিচয় সংরক্ষণ ও ইসলামি চেতনা জাগ্রত রাখার একটি কার্যকর মাধ্যম।
হিজরি সনের শিক্ষানতুন হিজরি বছর মানুষকে নিজের অতীতের হিসাব গ্রহণের আহ্বান জানায়। জীবনের প্রতিটি বছর আমাদের মৃত্যুর দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দেয়। তাই সময়ের সঠিক ব্যবহার একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত- সুস্থতা ও অবসর সময়’ (বুখারি : ৬৪১২)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘পাঁচটি বিষয় আসার আগে পাঁচটি বিষয়কে মূল্যবান মনে করো- বার্ধক্যের আগে যৌবন, অসুস্থতার আগে সুস্থতা, দারিদ্র্যের আগে সম্পদ, ব্যস্ততার আগে অবসর এবং মৃত্যুর আগে জীবন’ (মুস্তাদরাক হাকিম : ৭৮৪৬)। হিজরি নববর্ষ আমাদের সময়ের মূল্য উপলব্ধি করতে এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কল্যাণকর কাজে ব্যয় করতে উদ্বুদ্ধ করে।
হিজরি সন কেবল একটি বর্ষপঞ্জি নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও পুনর্জাগরণের প্রতীক। এটি আমাদের শেখায় সময়ের মূল্য, ত্যাগের মহত্ত্ব, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং আত্মশুদ্ধির গুরুত্ব। নতুন হিজরি বছর আমাদের জীবনে নতুন উদ্দীপনা, প্রত্যয় এবং আত্মিক জাগরণ নিয়ে আসুক। হিজরতের মহান শিক্ষা ধারণ করে আমরা যদি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সত্য, ন্যায়, তাকওয়া ও ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তবেই হিজরি সনের প্রকৃত তাৎপর্য বাস্তবায়িত হবে।