আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনার ক্ষেত্রে নতুন এক মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশের গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল রিসার্চ (জাভার)’। সম্প্রতি স্পেনভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান মূল্যায়নকারী সিমাগো ইনস্টিটিউশনস র্যাঙ্কিংস ‘সিমাগো জার্নাল র্যাঙ্ক-২০২৫’ প্রকাশিত হয়েছে।
সেখানে আন্তর্জাতিক জার্নাল মূল্যায়ন সূচক অনুযায়ী, স্কোপাসভুক্ত বাংলাদেশের সব গবেষণা সাময়িকীর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত জার্নাল ‘জাভার’। একই সঙ্গে ভেটেরিনারি সায়েন্স বিষয়ে এশিয়ার মধ্যে দশম স্থান লাভ করেছে সাময়িকীটি।
এমনটাই জানিয়েছেন জার্নালটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক এবং বাকৃবি মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. কে. এইচ. এম. নাজমুল হুসাইন নাজির।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশিত ১৪টি গবেষণা সাময়িকী স্কোপাস ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান অর্জন করেছে ‘জাভার’। অন্যদিকে, ভেটেরিনারি বিজ্ঞান বিষয়ে এশিয়ার ৪৪টি সাময়িকীর মধ্যে দশম স্থান অর্জনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে নতুন মর্যাদা লাভ করেছে বাংলাদেশি এই জার্নাল। বাকৃবির মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগ থেকে পরিচালিত এবং নেটওয়ার্ক ফর দি ভেটেরিনারিয়ানস অব বাংলাদেশ (বিডিভেটনেট) কর্তৃক প্রকাশিত এবং বাংলাদেশের একমাত্র ‘কিউ-২’ ভুক্ত জার্নাল এটি। আমরা আর মাত্র দুইটি জার্নালকে পেছনে ফেলতে পারলে ‘কিউ-১’ ভুক্ত হতে পারবো। এটি কঠিন, তবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, শুধু এশিয়াতেই নয়, বৈশ্বিক পর্যায়েও উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে জাভার। সিমাগো জার্নাল র্যাঙ্ক-২০২৫ অনুযায়ী, বিশ্বের ২০৪টি ভেটেরিনারি বিজ্ঞান সাময়িকীর মধ্যে এর অবস্থান ৫৪তম। বর্তমানে সাময়িকীটির এসজেআর স্কোর ০ দশমিক ৪৬২, উদ্ধৃতি-ভিত্তিক স্কোর ৩ দশমিক ০ এবং মানসূচক শ্রেণিতে ‘কিউ-২’ পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের একমাত্র ‘কিউ-২’ সাময়িকী। এছাড়া এর এইচ-সূচক ২৯, ইম্প্যাক্ট সূচক ১ দশমিক ৫ এবং পাঁচ বছরের গড় ইম্প্যাক্ট সূচক ১ দশমিক ৯।
ড. নাজির জানান, প্রাণিসম্পদ, ভেটেরিনারি চিকিৎসা, প্রাণিস্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে জাভার। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত জাভার প্রতি বছর মার্চ, জুন, সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরসহ চারটি সংখ্যায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠার চার বছরের মাথায়, ২০১৮ সালে সাময়িকীটি প্রথমবারের মতো স্কোপাসে অন্তর্ভুক্ত হয়। এখন পর্যন্ত ১০৭০ টি গবেষণা প্রবন্ধ জার্নালটিতে প্রকাশিত হয়েছে, যার সবগুলোই স্কোপাস ইনডেক্সের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, মালয়েশিয়া, চীনসহ পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য আমাদের কাছে পাঠানো হয়।
জার্নালটির সম্পাদক প্যানেলের সদস্য অধ্যাপক ড. মোছা. মিনারা খাতুন বলেন, এসব সূচক কোনো সাময়িকীর বৈজ্ঞানিক মান, গ্রহণযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। ফলে জাভারের এই অর্জন বাংলাদেশের গবেষণা প্রকাশনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গবেষণার নতুনত্ব, কঠোর সমীক্ষা ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া, মানসম্পন্ন সম্পাদকীয় ব্যবস্থাপনা এবং প্রকাশনার গুণগত মান নিশ্চিত করার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে জাভার।
এ বিষয়ে বাকৃবির মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলজার হোসেন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে স্কোপাস জার্নাল সবচেয়ে বেশি ভারতের। তবে বাংলাদেশে যে ১৪টি জার্নাল রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে জাভার। এটি বাকৃবির র্যাংকিং বিশ্বপর্যায়ে উন্নতিতেও ভূমিকা রাখছে। দেশের গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশেও অবদান রাখছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা প্রকাশনায় বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতিফলন ‘জাভার’।
বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান বলেন, এই অর্জন কেবল একটি গবেষণা সাময়িকীর সাফল্য নয়। বরং বাংলাদেশের ভেটেরিনারি ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক গবেষণার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রতীক। এই জার্নালে দেশীয় গবেষণার চেয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণার প্রকামনা বেশি, এটিও আমাদের জন্য গর্বের৷ আমরা খুব শীঘ্রই ‘কিউ-২’ থেকে ‘কিউ-১’ এ উন্নীত হবো। জাভারকে দেখে দেশের অন্যান্য জার্নালগুলো আরও অনুপ্রাণিত হবে।
তিনি আরও বলেন, এই সাফল্যের পেছনে দেশ-বিদেশের সম্পাদকমণ্ডলী, পর্যালোচক, লেখক, পাঠক এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সম্মিলিত অবদান রয়েছে। ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা প্রকাশ, উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চা এবং বৈশ্বিক গবেষণা সহযোগিতা সম্প্রসারণে জাভার অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে।
সময়ের আলো/জোই