বিশ্বকাপ মানেই গোল, উল্লাস আর তারকাদের ঝলক। মাঠে সেদিন গোল করেছিলেন জুলিয়ান কিনিওনেস ও রাউল হিমেনেস। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয় পেয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছিল পুরো মেক্সিকো। কিন্তু ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন না কোনো ফুটবলার। সবার নজর কেড়ে নিয়েছিল দুই বছর বয়সী এক হাঁস— তার নাম মার্লিন।
মেক্সিকো জাতীয় দলের সবুজ জার্সি আর ছোট্ট মোজা পরে সে হাজির হয়েছিল উৎসবমুখর রাস্তায়। হাজারো সমর্থকের সঙ্গে মেক্সিকো সিটির রাজপথে হাঁটছিল সে, যেন দলেরই একজন খেলোয়াড়। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, আবার কেউ আদর করে ডাকছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে মার্লিনের ছবি ও ভিডিও। লাখো মানুষ তাকে দেখতে শুরু করে, আর রাতারাতি সে হয়ে ওঠে বিশ্বকাপের প্রথম অনানুষ্ঠানিক মাসকট।
সামাজিক মাধ্যমেও শুরু হয় মার্লিন-উন্মাদনা। একজন লিখলেন, আমরা মার্লিনকে স্টেডিয়ামে দেখতে চাই। আরেকজন বললেন, এই হাঁস ইতোমধ্যেই জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। কেউ আবার মন্তব্য করলেন, এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেরা বিষয়ই হলো এই হাঁস।
তবে মেক্সিকো সিটির মানুষের কাছে মার্লিন নতুন কোনো মুখ নয়। তার মালিক কার্লা গোমেজ প্রতি সপ্তাহান্তে একটি ছোট ঠেলাগাড়িতে পানি ও কোমল পানীয় বিক্রি করেন। বিভিন্ন মেলা, উৎসব ও জনসমাগমে তিনি সবসময় মার্লিনকে সঙ্গে নিয়ে যান। ফলে পথচারীদের সঙ্গে ছবি তোলা, শুভেচ্ছা পাওয়া কিংবা মানুষের ভালোবাসা পাওয়া তার জন্য নতুন কিছু ছিল না।
কার্লা হাসতে হাসতে বলেন, আমরা ওকে বাড়িতে একা রেখে যেতে পছন্দ করি না। সে আমাদের সন্তানের মতো। বরং সে-ই আমাদের একমাত্র উত্তরাধিকারী, আর এখন তো সে মানুষের আইডলে পরিণত হয়েছে।
বৃষ্টি হোক বা রোদ, মার্লিন সবসময় কার্লা ও তার ছেলে ক্রিস্টিয়ানের সঙ্গেই থাকে। মেক্সিকো সিটির বিখ্যাত আলামেদা সেন্ট্রাল, প্যালেস অব ফাইন আর্টস কিংবা জোকালো স্কয়ার—সব জায়গায় তাদের সঙ্গী এই হাঁসটি। আসলে মার্লিনকে প্রথমে উপহার দেওয়া হয়েছিল ছোট্ট ক্রিস্টিয়ানের জন্য। এরপর থেকেই দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। কার্লার ভাষায়, মার্লিন এখন ক্রিস্টিয়ানের ছায়াসঙ্গী।
মার্লিন আগে থেকেই কিছুটা পরিচিত ছিল। ঠেলাগাড়িতে পানি বিক্রির সময় মানুষ তাকে দেখে মুগ্ধ হতো। কিন্তু বিশ্বকাপের এই উন্মাদনায় সে যে আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত হবে, তা কেউ ভাবেনি।
কার্লা বলেন, সে সবসময় আমাদের সঙ্গে থাকে। কিন্তু এত বড় আলোড়ন সৃষ্টি করবে, তা কখনো কল্পনা করিনি।
এখন পুরো পরিবারটির বিশ্বাস, মেক্সিকোর এই পালকওয়ালা সমর্থক হয়তো দলের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করছে মেক্সিকো। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ সালের পর এবার তারা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে এই মহাযজ্ঞের আয়োজন করছে।
আর এই বিশ্বকাপে যখন কোটি কোটি মানুষ ফুটবল তারকাদের খুঁজছে, তখন মেক্সিকোর হৃদয় জয় করে নিয়েছে এক ছোট্ট হাঁস।
কার্লা গোমেজের শেষ কথাটিই যেন মার্লিনের পক্ষ থেকে পুরো দেশের উদ্দেশে এক ভালোবাসার বার্তা— মেক্সিকো, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি। আর মার্লিন হলো তোমাদের এক নম্বর ভক্ত।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ