আগামী নির্বাচনে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় টিকে থাকার আশা অনেক দিন ধরেই নড়বড়ে ছিল। তবে সম্প্রতি তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি এবং লেবানন যুদ্ধ অবসানের মার্কিন সিদ্ধান্ত এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নেতানিয়াহুর দম্ভোক্তি এখন ইসরায়েলি ভোটারদের কাছে ক্রমশ অন্তঃসারশূন্য বলে মনে হচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলায় নিরাপত্তা ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনার মুখে থাকা ৭৬ বছর বয়সী এই নেতা আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। জনমত জরিপ অনুযায়ী তার ডানপন্থী ‘লিকুদ পার্টি’ এবং ক্ষমতাসীন জোটের বড় পরাজয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাকে একসময় ‘কিং বিবি’ বলে ডাকলেও, সমালোচকদের কাছে তিনি এখন তীব্র রোষের পাত্র। নেতানিয়াহুর দল তাকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের ঘোর বিরোধী এবং ইরানের ওপর হামলার কট্টরপন্থী প্রবক্তা হিসেবে চিত্রিত করে আসছিল।
তিনি নিজেও ২০২৫ সালে বলেছিলেন, জর্ডান নদীর পশ্চিমে কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হতে দেবেন না। তবে হামাসের হামলার পর তার সেই যুদ্ধবাজ ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়, যার জন্য তিনি কোনো দায় নেননি বলে মনে করছেন দেশটির জনগণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজা ও লেবাননে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ ইসরায়েলি সেনার মৃত্যু এবং কোনো স্থায়ী বিজয় না আসায় তার নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অভ্যন্তরীণ সমালোচকদের মতে, নেতানিয়াহু গাজা সীমান্ত থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরিয়ে নিয়ে হামাসকে উপেক্ষা করেছিলেন। হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড ইসরায়েলে উদযাপিত হলেও, হামাস এখনও গাজা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং লেবাননে হিজবুল্লাহ টিকে আছে।
ট্রাম্প প্রশাসন নতুন যুদ্ধবিরতি আরোপ করার পর বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ কড়া সমালোচনা করে বলেন, ‘নেতানিয়াহু যুদ্ধে হেরে গেছেন, চূড়ান্ত মুহূর্তে তিনি ভেঙে পড়েছেন।’
অবশ্য নেতানিয়াহু এই সমালোচনাকে অপপ্রচার দাবি করে বলেছেন, সময়মতো অপ্রতিরোধ্য শক্তি দিয়ে পদক্ষেপ না নিলে আজ ইসরায়েলের অস্তিত্ব থাকত না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেতানিয়াহু এখন কোণঠাসা। গাজার ধ্বংসযজ্ঞের ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) যুদ্ধঅপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। পশ্চিমা সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরাগভাজন হয়েছেন।
এদিকে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা আন্তর্জাতিক শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করেছে। বিষয়টিকে ইসরায়েলিদের একাংশ মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার হিসেবে দেখছে। রিপাবলিকানদের সাথে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সমর্থন কমছে ইসরায়েলের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে ‘একেবারে পাগল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার এড়িয়ে যাওয়ার যে উত্তরাধিকার তিনি রেখে যেতে চেয়েছিলেন, ২০২৩ সালের হামাসের হামলা ও গাজা যুদ্ধ তা অসম্ভব করে তুলেছে। ফলে পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েলের অবস্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন তীব্র বিতর্কের মুখে।
সূত্র : রয়টার্স
সময়ের আলো/জেডি