ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর বিপর্যস্ত নেপালের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়তে থাকায় নেপালকে দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ এবং নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।
গত ৩১ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আল জাজিরা জানায়, নেপালের রাসুয়া ও নুয়াকোট অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার পাঁচ দিন পরও নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল। চার হাজার সাতশোর বেশি মানুষের অবস্থান তখনও অজানা ছিল। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল।
এই দুর্যোগের পেছনে হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস থেকে সৃষ্ট একটি ধারাবাহিক প্রাকৃতিক ঘটনা ভূমিকা রেখেছে বলে প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এতে লেন্দে খোলা নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি, পাথর ও পলি নেমে আসে এবং তা ভোতে কোশি-ত্রিশূলি নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত হয়।
এর ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। সেটি ভবিষ্যতে আরও একটি আকস্মিক বন্যার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জরুরি
প্রাথমিক ধসের ঘটনা নেপালের পক্ষে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও, এই বিপর্যয় দেশটির দুর্যোগ প্রস্তুতির বড় ধরনের ঘাটতি সামনে এনেছে।
নেপালের এখন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ও বন্যার জন্য অগ্রিম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে অস্থিতিশীল হিমবাহ, ভূমিধসে আটকে থাকা হ্রদ এবং নদীপথগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত সেন্সরগুলো দ্রুত সচল করার পাশাপাশি পাহাড়ি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও নদীর নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ২৪ ঘণ্টা রিয়েল-টাইম যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে চীনের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় দুর্যোগের তথ্য আদান-প্রদান আরও জোরদার করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ অবকাঠামো নির্মাণের আগে নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়নও জরুরি।
এসএমএস, সাইরেন ও স্থানীয় রেডিওতে সতর্কবার্তা
দুর্যোগের সময় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আগেই নির্দিষ্ট সতর্কতার মাত্রা বা ‘ইভাকুয়েশন ট্রিগার’ ঠিক করতে হবে।
একই সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে হবে এবং একাধিক মাধ্যমে সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে— মোবাইল ফোনে এসএমএস সতর্কবার্তা, সাইরেন, স্থানীয় রেডিও এবং স্থানীয় প্রশাসনের সরাসরি ঘোষণা।
এসব ব্যবস্থা দ্রুত চালু করা গেলে আকস্মিক বন্যার ক্ষেত্রে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত সময় দেওয়া সম্ভব।
শুধু সতর্কীকরণ নয়, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোও দরকার
হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমবাহ, হিমবাহের হ্রদ ও পাহাড়ের ঢাল ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
তাই শুধু আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তৈরি করলেই হবে না। নেপালকে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
বন্যা ও ভূমিধসের ধাক্কা সামলাতে সক্ষম সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সরকারি স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য যোগাযোগব্যবস্থা, জনসেবা, জীবিকা সুরক্ষা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা এখনই প্রয়োজন
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেপালের মতো দেশগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে তাদের অবদান অত্যন্ত কম। নেপাল বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ০.১ শতাংশেরও কম দায়ী।
তাই দেশটির জন্য জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধনী ও বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর কাছ থেকে শুধু প্রতীকী সহানুভূতি নয়, পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
বিশেষ করে লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে দ্রুত অর্থ পাওয়ার সুযোগ নেপালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও অবকাঠামোর কাছে পৌঁছে দেওয়ার দাবি রয়েছে।
তরুণরাই এগিয়ে আসছে উদ্ধারকাজে
বিপর্যয়ের মধ্যেও নেপালের তরুণদের উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরা রাসুয়া রিলিফ গ্রুপ গঠন করে ত্রাণ সংগ্রহ, সহায়তা সমন্বয় এবং যাচাই করা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করছে।
অনেক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছেন। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে তরুণরা যেমন অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী, তেমনি দুর্যোগের সময় তারাই দ্রুততম সময়ে প্রথম সাড়াদানকারী হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় মানুষ ও তরুণদের অংশগ্রহণের আহ্বান
রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিংয়ের ভয়াবহ বন্যা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, শুধু জলবায়ু সম্মেলন, নীতিমালা ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না।
ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবেলার পরিকল্পনা তৈরির সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও তরুণদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ যারা প্রতিদিন পাহাড়, নদী ও হিমবাহের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও বাস্তব জ্ঞানই হয়তো পরবর্তী ভয়াবহ দুর্যোগের আগে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ দেখাতে পারে।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/ইউএমএইচ