চার মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধাবসানের লক্ষ্যে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করলেও, মাঠপর্যায়ের চরম উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যেই রোববার (২১ জুন) সুইজারল্যান্ডে মুখোমুখি বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। তবে ঐতিহাসিক এই শান্তি বৈঠক শুরুর আগমুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে দেখা দিয়েছে চরম নাটকীয়তা। একদিকে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে, অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছেন।
৬ দিন আগে গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সই করা মধ্যবর্তী চুক্তি অনুযায়ী ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল দুই দেশ। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এই শান্তি প্রক্রিয়ার স্থায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের সংশয় তৈরি করেছে।
গতকাল শনিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা করে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করেছে, তাই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দেওয়া হলো।
তবে ওয়াশিংটন এই দাবি সরাসরি নাকচ করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবারও প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল নিয়ে ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ কোনো বাধা ছাড়াই হরমুজ প্রণালী পার হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার কোনো প্রমাণ তারা পাননি এবং আন্তর্জাতিক এই জলপথে বাণিজ্যিক চলাচল স্বাভাবিক রাখতে মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত।
এদিকে এই পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বভাবসুলভ কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালীন বা তার পরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের জন্য কোনো টোল বা শুল্ক নেওয়া হবে না— যদি না শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ বা অভিভাবক হিসেবে সেবা দেওয়ার সুবাদে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালীতে টোল আরোপ করতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
আজকের এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সাথে রয়েছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। অন্যদিকে ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান পরমাণু পরিকল্পনাকারী মোহাম্মদ বাকের কোয়ালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
এই শান্তি আলোচনার মূল মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ অসীম মুনিরও এই অধিবেশনে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবের অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার ১৪ দফার অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রথম শর্তই (সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি) বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, চুক্তি যদি শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধই থাকবে।
লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মাথায় শনিবার দক্ষিণ লেবানন ও বেকা উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের দাবি, হরমুজ চুক্তির অংশীদার তারা নয় এবং তাদের ওপর হিজবুল্লাহর ৫০টি রকেট হামলার জবাবেই এই ‘প্রতিরক্ষামূলক’ ব্যবস্থা।
এইদিকে সুইজারল্যান্ডে শুরু হওয়া এই বৈঠক নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আশা প্রকাশ করে বলেছেন, আশা করি আমরা পরমাণু ইস্যু এবং লেবাননের যুদ্ধবিরতি— উভয় ক্ষেত্রেই অগ্রগতি অর্জন করতে পারব।
সময়ের আলো/কহু