গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। দলটির বিরুদ্ধে ওঠা গণহত্যা ও দমন-পীড়নের অভিযোগ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো আত্মসমালোচনা বা অনুশোচনার বার্তা না আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে তাদের কর্মসূচি ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতের সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের প্রশ্নে দলটি এখনও দায় স্বীকারের পথে হাঁটেনি। বরং দলটি আগের অবস্থানেই রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের আগে কয়েক মাস ধরে চলা আন্দোলন, দমন-পীড়ন, গুম, গ্রেফতার ও প্রাণহানির ঘটনায় দেশের বিভিন্ন মহলে আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে আসছে, ক্ষমতা ধরে রাখতে দলটি রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভয়ভীতি ও সহিংসতার রাজনীতি চালিয়েছে।
অবশ্য, দলটির বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগকে বরাবরই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা সামাজিক মাধ্যমে দাবি করছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তারা দলের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবার শুধু দলীয় ইতিহাস স্মরণের দিন নয়, এটি দলটির সাংগঠনিক অস্তিত্বেরও এক ধরনের পরীক্ষা বলে মনে করছেন তারা। তারা ঐক্যবদ্ধ থেকে সারা দেশে ব্যাপক শোডাউন করার ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বেড়েছে উত্তেজনা। ইতিমধ্যে দলটির রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী (জাতীয় ও দলীয়) পতাকা মিছিল ও বড় ধরনের শোডাউনের প্রস্তুতি রয়েছে। দলসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো পোস্টার, লিফলেট প্রচার, দেয়াল লিখন, নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের প্রোফাইল পিকচার ব্যবহার করার নির্দেশনা রয়েছে আওয়ামী লীগের।
এতে করে আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে গোপন কর্মসূচি, আকস্মিক শোডাউন কিংবা প্রতীকী সমাবেশের ছক রয়েছে। সংগত কারণে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের ৬টি জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
অপরদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনের মাধ্যমে দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। সংসদে পাস হওয়া সংশোধিত আইনে আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, সমাবেশ, এমনকি অনলাইন প্রচারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই দলটির কেন্দ্রীয়সহ তৃণমূলের নেতৃত্বের বড় অংশ আত্মগোপনে ও বিদেশে চলে যান। দলটির কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, এমপিসহ বিরাট একটি অংশ গ্রেফতার হয়। তবে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একটি বড় অংশ এখনও সক্রিয় রয়েছে।
তারা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে মিছিল ও সমাবেশ করে যাচ্ছেন তারা। একই সঙ্গে দলটির বিদেশে থাকা নেতাকর্মীরা ভার্চুয়ালি আলোচনা সভা করে দেশে থাকা নেতাকর্মীদের মাঠে নামতে উঠৎসাহ দিচ্ছেন। তারা আর অনলাইনে না থেকে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চান। ফলে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে আজ দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে বেছে নিতে চান কর্মী ও সমর্থকদের একটি বড় অংশ।
এরই অংশ হিসেবে তারা রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক শোডাউনের প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিশেষ করে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, ধানমন্ডি-৩২, শাহবাগ, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, পল্টন, বায়তুল মোকাররমের উত্তর-দক্ষিণ গেট, মহাখালী, ফার্মগেট, মিরপুর, পুরান ঢাকার কয়েকটি এলাকাকে বেছে নিতে পারে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় দলগুলোর মধ্যে আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি দুর্বল। তবে আওয়ামী লীগের মতো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একটি দলের জন্য এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দলটি ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে দেশের যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা ছিল।
কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য বড় ধরনের সংকটের পর আত্মসমালোচনা বা জনসমক্ষে দায় স্বীকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের বর্তমান অবস্থান ও বক্তব্যে সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। বরং দলটির নেতাদের বক্তব্যে এখনও নিজেদের অবস্থানকে ন্যায্য হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ হওয়া উচিত অতীতের ভুল পর্যালোচনা। কিন্তু আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে সেটি না হওয়ায় দলটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে জন আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।
দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা দেখা গেলেও সেখানে অতীতের সহিংসতা নিয়ে আত্মসমালোচনার কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং দলটির সমর্থকরা দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের জন্য ২৩ জুন একটি ঐতিহাসিক ও আবেগঘন দিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে ঢাকার ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে দলটির যাত্রা শুরু হয়। ফলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ অবস্থাতেও দলটির অনুসারীরা দিনটিকে কেন্দ্র করে কোনো না কোনোভাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করবেন। তারা বড় ধরনের কোনো শোডাউন করার চেষ্টা করবে- এটাই স্বাভাবিক।
ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বার্তা ছড়ানো হয়েছে। দলীয় কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এসব বার্তার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে হঠাৎ জমায়েতের চেষ্টা হতে পারে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবার শুধু দলীয় ইতিহাস স্মরণের দিন নয়, এটি দলটির সাংগঠনিক অস্তিত্বেরও এক ধরনের পরীক্ষা। একই সঙ্গে এটি সরকারের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে আরেকটি বড় উদ্বেগ হচ্ছে পাল্টাপাল্টি অবস্থান থেকে সংঘর্ষের সম্ভাবনা। কারণ, আওয়ামী লীগের কর্মীরা যদি রাস্তায় নামার চেষ্টা করেন, তবে তাদের বিরোধী পক্ষ কিংবা জুলাই আন্দোলনের সমর্থক গোষ্ঠীগুলোও প্রতিরোধে নামতে পারে। এতে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে যদি দলটি অতীতের সহিংসতা, প্রাণহানি ও দমন-পীড়নের বিষয়ে কোনো বার্তা না দেয়, তা হলে অনুশোচনাহীন রাজনীতির অভিযোগ আরও জোরালো হবে। আর সেটি দলটির পুনর্গঠনের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বিগত সময়ের সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া রাজনৈতিক পুনর্মিলন সম্ভব নয়। তাদের মতে, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি থাকবে।
ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবের মুখে গণহত্যার দায় আওয়ামী লীগ এড়াতে পারে না। এখন দলটির নেতাকর্মীরা হতবাক ও দিশাহারা হয়ে পড়েছে। জুলাই গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগ সামাজিক, রাজনৈতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটেছে। ফলে দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মাঠে নামবে বলে মনে হয় না। কারণ তাদের মধ্যে ভীতি আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগকে ফিরে আসাটা নির্ভর করছে সরকারি দল বিএনপি ও সরকারের ওপর। দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বড় ধরনের কোনো শোডাউন করলে তার খেসারত দলটিকে দিতে হবে। কারণ দলটি জুলাই আন্দোলনে যে গণহত্যা হয়েছে, তার জন্য অনুশোচনা নেই। যেহেতু দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সে কারণে ধীরস্থিরভাবে এগোনো উচিত। জুলাই আন্দোলনে যারা ছিলেন, তারাও সক্রিয় রয়েছেন। শুধু শুধু আওয়ামী লীগের এগ্রেসিভ হওয়া ঠিক হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন বেপারি বলেন, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে দেশকে স্থিতিশীল করা কঠিন। আবার তাদের রাজনীতি করার সুযোগ দিলে জামায়াত-এনসিপি মেনে নেবে না। জুলাইয় আন্দোলনে যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, সে জন্য দলটি এখনও অনুতপ্তবোধ করছে না। ফলে এটা জুলাই আন্দোলনকারীরা মেনে নেবে না।
দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মাঠে নামাটা ঠিক হবে না। এতে সংঘাত বাড়বে। ইতোমধ্যে সরকার ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। আওয়ামী লীগকে ধীরে ধীরে কার্যক্রম চালানো উচিত।
সময়ের আলো/জেডি