ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের রাশ টেনে ধরতে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করতে মার্কিন সিনেটে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস হয়েছে। এই প্রস্তাবের মূল শর্ত হলো— ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের নতুন সামরিক পদক্ষেপ বা দীর্ঘমেয়াদি অভিযান পরিচালনার আগে হোয়াইট হাউসকে অবশ্যই মার্কিন কংগ্রেসের বাধ্যতামূলক ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নিতে হবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) মার্কিন সিনেটে তুমুল আলোচনা ও বিতর্কের পর প্রস্তাবটি ৫০-৪৮ ভোটের ব্যবধানে পাস হয়। এর আগে চলতি জুনের শুরুর দিকে এই বিলটি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদেও (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়েছিল।
বর্তমান মার্কিন সিনেটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও দলটির ভেতরে বড় ধরনের ফাটল দেখা গেছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে চারজন রক্ষণশীল রিপাবলিকান সিনেটর এই বিলের পক্ষে অর্থাৎ ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে একজন মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রায় সব সদস্য এই প্রস্তাবের পক্ষে একাট্টা হয়ে সমর্থন জানান।
মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে এবারই প্রথম যুদ্ধসংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ (সিনেট) এবং নিম্নকক্ষ (প্রতিনিধি পরিষদ)— উভয় বিভাগেই সফলভাবে পাস করার গৌরব অর্জন করল।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপটি মূলত একটি বড় ধরনের প্রতীকী ধাক্কা হিসেবেই রয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ, মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টকে দেওয়া বিশেষ ক্ষমতার অংশ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রস্তাবে ‘ভেটো’ (বাতিল করার ক্ষমতা) প্রয়োগ করবেন বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে।
দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দেওয়া চার রিপাবলিকান সিনেটর হলেন— লুইসিয়ানার বিল কাসিডি, আলাস্কার লিসা মুরকোস্কি, মেইনের সুসান কলিন্স এবং কেনটাকির র্যান্ড পল। এ ছাড়া কেনটাকির মিচ ম্যাককনেল এবং পেনসিলভেনিয়ার ডেভ ম্যাককরমিক নামের দুই প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন।
ভোটের পর মার্কিন সিনেটের ডেমোক্রেট নেতা চাক শুমার ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বছরের পর বছর ধরে ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের ফাঁকা বুলি দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তিনি এই ধ্বংসাত্মক ও অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকার সাধারণ মানুষের জন্য কেবল চরম বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা এবং বিপুল আর্থিক ও মানবিক ক্ষয়ক্ষতি বয়ে এনেছেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, ট্রাম্পের এই ঐতিহাসিক ভুলের জন্য মার্কিন জনগণকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে এবং এটি আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম একটি নিকৃষ্ট ভুল পদক্ষেপ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
পাস হওয়া এই যুদ্ধসংক্রান্ত প্রস্তাবে মূলত ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সব ধরনের বৈরিতা ও সামরিক সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করে সেখান থেকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীকে পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে প্রস্তাবটিতে একটি বিশেষ ছাড়ও রাখা হয়েছে; মার্কিন ভূখণ্ড কিংবা তাদের কোনো আন্তর্জাতিক মিত্রদের ওপর ‘সুনির্দিষ্ট কোনো হামলার’ হুমকি তৈরি হলে, তা প্রতিরোধের জন্য সাময়িকভাবে সীমিত আকারে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে পারবেন প্রেসিডেন্ট।
তবে এই প্রস্তাবের বিরোধিতাকারীরা ট্রাম্পের পক্ষ নিয়ে ভিন্ন যুক্তি দেখাচ্ছেন। আইডাহোর রিপাবলিকান সিনেটর জেমস রিশ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “এই প্রস্তাবটি এমন এক সময়ে পাস হলো যখন সুইজারল্যান্ডে ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। এর ফলে আলোচনায় ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান চরমভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। ইরানিরা ভাববে কংগ্রেস তো প্রেসিডেন্টের ব্যবস্থাপনাই কেড়ে নিয়েছে, সুতরাং তারা আলোচনা ছেড়ে চলে যেতে পারে।”
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমতেও এই যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স এবং ইপসোসের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৪ শতাংশ সাধারণ আমেরিকান নাগরিক ইরানের সঙ্গে চলমান এই যুদ্ধকে যৌক্তিক বা সঠিক বলে মনে করছেন। বাকি সিংহভাগ মানুষই এই সংঘাতের দ্রুত অবসান চান।
সময়ের আলো/জেডি