সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো নাটকীয়ভাবে বন্দি হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতায় বসেন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ছয় মাসের মাথায় এসে দেশের ইতিহাসের ‘শতাব্দীর ভয়াবহতম দুর্যোগের’ (ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্প) মুখোমুখি হয়ে তার নেতৃত্ব এখন এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়েছে।
মাদুরোর দীর্ঘদিনের এই মিত্র ভেনেজুয়েলার মসনদে বসার পর প্রথম ছয় মাসে দেশটির অর্থনীতি উদারীকরণ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন জয় করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা থেকে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে সক্ষম হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাদুরোর আমলের দমনমূলক এবং দুর্নীতিগ্রস্ত শাসন কাঠামো দেশটিতে এখনও রয়ে গেছে; এমনকি একটি গণতান্ত্রিক সাধারণ নির্বাচনের জন্যও কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এখনও নিম্ন মজুরি, দুর্বল মুদ্রা ও চরম মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিপর্যস্ত, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেই হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ নাগরিকরা।
চলতি সপ্তাহের এই বিধ্বংসী ভূমিকম্প রদ্রিগেজের দেওয়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতিকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও গবেষণা সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা’-এর লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের সিনিয়র বিশ্লেষক টিজিয়ানো ব্রেদা বলেন, এই স্কেলের একটি বড় বিপর্যয় ডেলসি রদ্রিগেজের সামনে কেবল মাদুরোর একজন কেয়ারটেকার বা ভারপ্রাপ্ত উত্তরসূরি হিসেবে নয়, বরং নিজেকে একজন প্রকৃত ‘জাতীয় নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ এনে দিয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের উন্নতির সুবাদে ভেনেজুয়েলা এখন আন্তর্জাতিক মহল থেকে মানবিক সাহায্য এবং পুনর্গঠন সহায়তা সহজেই মোবিলাইজ বা সচল করতে পারবে।
তবে এই সংকট মোকাবিলা করা রদ্রিগেজ প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করেন ব্রেদা। তার মতে, ত্রাণ বিতরণে কোনো ধরনের দুর্নীতি, বিলম্ব বা রাজনৈতিকীকরণ হলে এবং তা জনসাধারণের চোখে ধরা পড়লে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত সাধারণ মানুষ বড় ধরনের গণ-বিক্ষোভের দিকে পা বাড়াতে পারে।
নিকোলাস মাদুরোর পতনের পর থেকেই ভেনেজুয়েলার নাগরিকরা তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ খুঁজছেন। এসিএলইডির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ভেনেজুয়েলায় ১,৪০০-এরও বেশি বিক্ষোভ রেকর্ড করা হয়েছে— যা সমগ্র ২০২৫ সালের মোট বিক্ষোভের দ্বিগুণেরও বেশি।
এদিকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিবিদ হোর্হে হ্রাইসাতি এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি সক্ষমতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। সিএনএনের সাংবাদিক বেন হান্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার ও সাহায্য কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে কারণ ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে কোনো ‘কার্যকর রাষ্ট্র কাঠামো’ বা সচল সরকার নেই। তার দাবি, দুর্গতদের প্রকৃত অর্থে সাহায্য করার মতো ভেনেজুয়েলা সরকারের কোনো প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সক্ষমতা বা সদিচ্ছা— কোনোটিই নেই।
তবে ভূমিকম্পের পর এক টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আমি সবাইকে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে এবং শান্ত থাকার অনুরোধ করছি। আমরা এই কঠিন সময় ও ট্র্যাজেডি সবাই একসঙ্গে মিলে জয় করব।
সময়ের আলো/কহু